আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ এবং সমসাময়িক অন্যান্য বিষয়ে নানান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি আগে অন্তর্বর্তী সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেছেন।
আইন ও সংসদ বিষয়ক দায়িত্বে থাকা একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক হিসেবে মন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে সর্বসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিতর্কিত অধ্যাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট নীতি নিয়ে আইনগত ব্যাখ্যা প্রদান করে জনগণকে তথ্যভিত্তিক বোঝাপড়া গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, সংবিধান সংস্কারের প্রয়াস দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য। সম্প্রতি তিনি বর্তমান অধ্যাদেশ এবং সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান সমালোচনা নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
মো. আসাদুজ্জামান: আমি নিরন্তরভাবে চেষ্টা করে যাব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা—এ দুটি আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার পূরণে স্বচ্ছভাবে যা যা করণীয়, সেগুলো করে যাব আমরা।
মো. আসাদুজ্জামান: মামলাজট কয়েকটি কারণে হয়। প্রথমত, বিচারকের সংখ্যা কম; দ্বিতীয়ত, দক্ষ বিচারকের সংখ্যা কম; তৃতীয়ত, অবকাঠামোর সংকট; চতুর্থত, মামলা করার পর এখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে আইনজীবী, পুলিশ প্রশাসন, বিচারক ও পাবলিক প্রসিকিউটররা থাকেন। সবকিছু সমন্বয় করে মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হয়। এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য কী কী করণীয় আছে, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।
মো. আসাদুজ্জামান: ঠিক এখনই এটি আমি বলতে পারছি না। কারণ, জাতীয় সংসদ থেকে একটি বিশেষ কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি যাচাই-বাছাই করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। এরপর সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংসদে আলোচনার পর এটা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, বেশ কিছু অধ্যাদেশ সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জনের প্রয়োজন হবে। সবকিছু যে সঠিকভাবে ও সাংবিধানিকভাবে হয়েছে, সেটি বলা যাচ্ছে না। যেমন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অনেকটা সাংঘর্ষিক দেখা যাচ্ছে।
এর কারণ ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি নিয়োগ দেন। এখন অধ্যাদেশে একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেই কমিটির সভাপতি প্রধান বিচারপতি। কমিটিতে আরও সদস্য আছেন। বিচারপতি নিয়োগে এই কমিটি সুপারিশ করে। প্রধান বিচারপতি আলটিমেটলি ওই সুপারিশ ফরওয়ার্ড করবেন রাষ্ট্রপতির কাছে। এতে প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে। এটা যদি সংবিধান সংশোধন করে করা হতো, তাহলে সেখানে কোনো আপত্তির জায়গা থাকত না। কিন্তু একটি আইন (অধ্যাদেশ) দিয়ে যখনই করা হচ্ছে, তখন এটা আপাতদৃষ্টে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে।
মো. আসাদুজ্জামান: এটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। তখন সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
মো. আসাদুজ্জামান: এটিও আমরা যাচাই-বাছাই করছি। সংসদ যেভাবে আমাদের গাইড করবে, সেভাবে এগোব। অনেকেই হয়তো জেনে থাকবে অধস্তন আদালতের একজন সহকারী জজকে বদলি করা, পদোন্নতি দেওয়া বা শাস্তির আওতায় আনা—কোনো কিছু করার ক্ষমতা সরকারের বা আইন মন্ত্রণালয়ের নেই। অধস্তন আদালত বিচার কার্যক্রমে সম্পূর্ণ স্বাধীন। সুপ্রিম জুডিশিয়ারিও সম্পূর্ণ স্বাধীন। জুডিশিয়ারির ওপর সরকারের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে বিচারকেরা যদি মানসিকভাবে স্বাধীন না হন, যদি ন্যায়বিচারের জন্য বিচারকেরা তাঁদের স্বাধীনতা আইনের গণ্ডির মধ্যে থেকে চর্চা না করেন, তাহলে স্বাধীনতা কাগজে-কলমে থেকে যাবে। সুপ্রিম কোর্টের জজ সাহেবরা যখন শপথবদ্ধ বিচারপতি হন, রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করেন, তখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বাদ জনগণ পায় না। সুতরাং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যতটা না কাগজে–কলমে স্বাধীনতার প্রয়োজন, তার চেয়ে বিচারকদের মানসিকভাবে বেশি স্বাধীন হওয়া প্রয়োজন।
মো. আসাদুজ্জামান: অতীতে এত মামলা ছিল না। এত বেশিসংখ্যক কোর্টও ছিল না হয়তো। তবে যেহেতু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, আমরা বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখব।
মো. আসাদুজ্জামান: এ বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা শুরু করেছি। আশা করি, লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।
মো. আসাদুজ্জামান: আমরা পারফরম্যান্স (কর্মদক্ষতা) অনুযায়ী এগিয়ে যাব। যদি দেখি কারও পারফরম্যান্স খুব ভালো, তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখার চেষ্টা করব। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যদি মনে হয় কেউ ভিন্ন কোনো পন্থা অবলম্বন করছেন, সে ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেব। ইতিমধ্যেই দেখেছেন একজনকে (প্রসিকিউটর) চলে যেতে হয়েছে।
মো. আসাদুজ্জামান: একটা–দুইটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে—এটা আমি মনে করি না। বিচ্ছিন্ন ঘটনা কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়, সেটা আমরা করেছি। আমরা এটাকে প্রশ্রয় দিইনি। আর প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
মো. আসাদুজ্জামান: এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটরের অফিস থেকে একটা তদন্ত করা হচ্ছে—এটা এলে দেখব। প্রাথমিকভাবে টাকা নিয়েছেন, লেনদেন হয়েছে অ্যাকচুয়ালি (প্রকৃতপক্ষে)—এ ধরনের কোনো তথ্য-উপাত্ত আমাদের সামনে আসেনি বা কোনো পক্ষ থেকে এটার অভিযোগ আমাদের কাছে লিখিতভাবে করেনি।
মো. আসাদুজ্জামান: এর শেষ হওয়া প্রয়োজন বলেই ফৌজদারি কার্যবিধি ১৭৩ (ক) ধারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সংযোজন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপার এবং মহানগর এলাকায় পুলিশ কমিশনার বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে যদি হয়রানিমূলক কোনো তথ্য পান, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হয়রানি থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার পথ বের করতে পারেন। আমি মনে করি, এটা একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ। আরেকটা কথা, এসব মামলায় যদি ১০০ জনকে আসামি করা হয়, গ্রেপ্তারের হার কিন্তু ১০-১৫ জনের বেশি নয়। খুবই সংবেদনশীল ও যৌক্তিকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। নতুবা জুলাই চেতনার পরিপন্থী আসামিদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠবে।
মো. আসাদুজ্জামান: এসব বন্ধে ও সুশাসন নিশ্চিত করতে আমরা যেকোনো ধরনের সুপারিশকে গুরুত্ব দিয়ে যে যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা–ই নেব।
মো. আসাদুজ্জামান: তারা ভ্রান্ত একটা ব্যাখ্যা দিচ্ছে। প্রথমত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে জুলাই আদেশের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, আইনি ভিত্তি পোক্ত করার জন্য গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। জুলাই আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশ—এই দুটি বিষয় অবিকল আইনের মতো মনে হলেও কোনোটাই সাংবিধানিকভাবে বৈধ আইন নয়। এই দুটি তথাকথিত আইন পড়লে দেখবেন, এগুলো সংবিধান সংশোধনের শামিল, যা আমাদের বিদ্যমান সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বাইরে—এই ক্ষমতা শুধু সংসদের।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রকাশিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫: ভবিষ্যতের পথরেখা’ শীর্ষক পুস্তিকায় সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কারের বিষয়গুলো উল্লেখ (৬–ক) আছে। সেখানে ১৭ থেকে ২০ অনুচ্ছেদে আইনসভার উচ্চকক্ষের কথা বলা হয়েছে। এই ৬ক–এর আওতায় জুলাই সনদের ১ থেকে ৪৭টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, যা বাস্তবায়নের জন্য জুলাই সনদের ম্যান্ডেট অনুসারে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন। জুলাই সনদের মোট ৮৪টি অনুচ্ছেদের মধ্যে বাকি অনুচ্ছেদগুলো ৬খ–এর অন্তর্ভুক্ত, সেগুলো সাধারণ আইন কিংবা অধ্যাদেশ কিংবা বিধি-আদেশ দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য।
গণভোট অধ্যাদেশ কিংবা জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যা আইনসম্মত ও সাংবিধানিকভাবে হয়নি। যার কারণে এগুলোকে আইনের মর্যাদা দেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আদেশ ও আইনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। কোন আদেশ আইন, সেটা আগে বুঝতে হবে। যে আদেশগুলো কোনো আইনের বেকিংয়ে (ভিত্তিতে) হচ্ছে, যেমন ক্ষমতা দেওয়া হলো মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এই কাজ করতে পারবে। সেই ক্ষমতার আওতায় মন্ত্রণালয় যে আদেশ জারি করে, সেই আদেশ আইন।
জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ কোনো আইনের রেফারেন্স কিংবা ব্যাকিংয়ে (ভিত্তিতে) হয়নি, সে দৃষ্টিতে এটিও আইনের মর্যাদা পায় না। ১৯৭২ সালে সংবিধান আসার আগে রাষ্ট্রপতির কিছু আদেশ ছিল (পিও)। তখন সংবিধান ছিল না। এখন সংবিধান আছে। সুতরাং সংবিধান থাকা অবস্থায় এ ধরনের আদেশ সংবিধান সংশোধনের শামিল হয়ে যাচ্ছে। সেই আদেশকে বৈধ ভাবার কোনো কারণ নেই।
মো. আসাদুজ্জামান: আমরা জুলাই সনদের প্রতিটি প্যারাগ্রাফ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। জুলাই সনদের ২২ নম্বর ক্রমিকে (জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পদ্ধতি) আছে, নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে। এটি জুলাই সনদের ৬(ক) অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে বাস্তবায়নযোগ্য। তা সত্ত্বেও বিএনপি যতটা সম্ভব দক্ষ নারী প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করেছে। জামায়াতে ইসলামী কি এটা মেনেছে? তারা (জামায়াত) তো জুলাই সনদের ২২ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে।
জামায়াত এবং তাদের জোট ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর বিষয়ে কোনো নোট অব ডিসেন্ট দেয়নি। অথচ একজন নারীকেও জাতীয় নির্বাচনে তারা প্রার্থী করেনি। জুলাই সনদের একটা অংশ তারা লঙ্ঘন করেছে, আরেকটি অংশ নিয়ে তারা এইটা চাই বলে চিল্লাচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জুলাই সনদের আলোকে ডেপুটি স্পিকারের পদটা তাদের (বিরোধী দল) দেওয়ার জন্য অফার করেছিলেন। তারা নিল না। তাহলে আমরা জুলাই সনদ মানলাম নাকি ওনারা জুলাই সনদ মানলেন না—এ রকম অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারব।
আরেকটা কথা, উচ্চকক্ষের প্রোপরসনাল রিপ্রেজেন্টেশনের (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি) বিষয়ে বিএনপি একমত হয়নি। এ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট আছে, যা জুলাই সনদের ১৮ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে।
মো. আসাদুজ্জামান: জুলাই সনদ একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চুক্তি, যেটা করার ক্ষমতা বা এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর আছে। তবে এটি আদালতের মাধ্যমে প্রয়োগযোগ্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদের আলোকে সংবিধানের অন্যান্য বিধান অনুসরণ করে বর্তমান সংবিধান সংশোধন করতে পারে। এ ধরনের বৈধ সংশোধনীই কেবল আইনে রূপান্তরিত হতে পারে।
মো. আসাদুজ্জামান: এখন পর্যন্ত আমরা ব্যতিক্রমী আচরণ করেছি। সমালোচনা তো হচ্ছে। ভালো কাজ করলেও হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমাদের উদাহরণ হলো আমরা ব্যতিক্রম এবং সে পথ ধরেই হাঁটছি। সূত্র: প্রথম আলো

