“আমরা যুদ্ধ শুরু করব না, কিন্তু যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলা করার মতো অপ্রতিরোধ্য শক্তি আমাদের আছে,”—ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার কয়েক মাস আগে, এক বছর পূর্বে ইরানি সামরিক কমান্ডার হোসেন সালামি এই ঘোষণা দিয়েছিলেন।
ইরানের যুদ্ধরীতিকে প্রচলিত ভূখণ্ডগত প্রতিরক্ষার পরিবর্তে সম্মুখ প্রতিরক্ষার একটি স্তরবিন্যস্ত ব্যবস্থা হিসেবেই সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায়। তেহরান বিদেশে মিত্র বেসরকারি অংশীদার, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, দেশে দ্বৈত সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ণায়ক লড়াইগুলোকে তার মূল কেন্দ্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে।
বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানটি সেই সামরিক কাঠামোর পরিশীলিত রূপ এবং ভঙ্গুরতা—উভয়কেই স্পষ্ট করে তুলেছে। ইরানকে অচল করে দেওয়া অনেকের ধারণার চেয়ে কঠিন প্রমাণিত হয়েছে, অথচ নিজেদের ভূখণ্ডে একটি প্রথম সারির বিমান হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে দেশটি তার বাগাড়ম্বরের তুলনায় অনেক কম সক্ষম।
ইরানের যুদ্ধকৌশল এখন চরম পরীক্ষার সম্মুখীন।
১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এই মডেলের রূপরেখা তৈরি হতে শুরু করে। ক্রমাগত চাপের মুখে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিপ্লবী হালকা পদাতিক বাহিনী, অনুপ্রবেশ, ছত্রভঙ্গ কৌশল, শাহাদাতের সংস্কৃতি এবং পরবর্তীতে নৌবাহিনীর ব্যাপক আক্রমণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
ইরানের যুদ্ধ বিন্যাসে এখনও সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায়। আরতেশ নামে পরিচিত ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী প্রচলিত স্থল, নৌ, বিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সরবরাহ করে।
এর সমান্তরালে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), এবং বাসিজ আধাসামরিক সংগঠনটি গণসংহতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার রিজার্ভ হিসেবে কাজ করে। আরতেশ হলো রাষ্ট্রের প্রচলিত ঢাল; আইআরজিসি হলো শাসকগোষ্ঠীর অগ্রবর্তী তলোয়ার—ক্ষেপণাস্ত্র শাখা, অভিযান সংগঠক এবং রাজনৈতিক নিশ্চয়তা প্রদানকারী শক্তি।
তবে বাসিজকে একটি গোপন সম্মিলিত-অস্ত্র বাহিনী হিসেবে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। এটি মূলত সৈন্য সমাবেশ, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আদর্শগত প্রয়োগ এবং যুদ্ধকালীন শক্তিবৃদ্ধির জন্য একটি সহায়ক হালকা বাহিনী। এর নাগাল, সংখ্যা ও জবরদস্তিমূলক উপযোগিতা আছে, কিন্তু এর নিজস্ব কোনো স্বায়ত্তশাসিত বিমান বা গোলন্দাজ ইউনিট নেই।
চোকপয়েন্ট যুদ্ধ
১৯৮৮ সালের পর, ২০১০-এর দশকে সিরিয়া ও ইরাকে মোতায়েন হওয়া ছাড়া, আইআরজিসি ও আরতেশ উভয়ই বিদেশে খুব কম যুদ্ধ করেছে। সিরিয়া ও ইরাক ইরানকে নগর যুদ্ধ, অবরোধ এবং মিলিশিয়া একীকরণ সম্পর্কে শিক্ষা দিলেও, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ধারাবাহিক আক্রমণ, দূরপাল্লার অস্ত্র, ইলেকট্রনিক দমন ব্যবস্থা এবং বি-২ বোমারু বিমানের গভীর অনুপ্রবেশকারী হামলার জন্য প্রস্তুত করতে পারেনি।
ইরানের প্রকৃত উদ্ভাবন ছিল অন্যত্র। প্রথমত, অরাষ্ট্রীয় অংশীদারদের সঙ্গে জোট গঠন। ‘প্রক্সি’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ নয়—হিজবুল্লাহ, ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং হুথিদের নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে, যদিও তারা বৃহত্তর ইরানি কৌশলগত কাঠামোর অংশ। এই নেটওয়ার্ক তেহরানকে কৌশলগত গভীরতা দিয়েছে এবং ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির সুযোগ বাড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আইআরজিসির মহাকাশ শাখা অঞ্চলের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী এবং শক্তিশালী ড্রোন অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছে। তেহরান পাল্লা বৃদ্ধির সঙ্গে নির্ভুলতার সমন্বয় ঘটিয়েছে। ‘শাহেদ’ ড্রোন পরিবারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এটি আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য নয়, বরং ব্যাপক আক্রমণ, আকস্মিক আঘাত এবং ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
তৃতীয়ত, সামুদ্রিক স্তর। নিয়মিত নৌবাহিনী উপস্থিতি বজায় রাখে, অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীকে মাইন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগামী নৌযান, চালকবিহীন ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ডুবোজাহাজের মাধ্যমে একটি জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
এই সক্ষমতাগুলোর মাধ্যমে ইরান গভীর সমুদ্রের প্রচলিত যুদ্ধের পরিবর্তে সংকীর্ণ জলসীমায় ‘ঝাঁক কৌশল’ বা হয়রানিমূলক যুদ্ধপদ্ধতি অনুসরণ করে, যা বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল ব্যাহত করা এবং প্রবেশাধিকারকে কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত করার লক্ষ্যে পরিচালিত।
তবে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা, ট্যাঙ্কার আক্রমণ এবং হরমুজ প্রণালীর কাছে মাইন স্থাপন নিয়ে উদ্বেগ দেখাচ্ছে যে এই কৌশলও এখন সীমাবদ্ধতার মুখে।
প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা
আইআরজিসি নেতৃত্ব বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কায় কমান্ড কাঠামোকে নিম্নস্তরে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিল। এতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও, তা আকাশ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। “ক্ষেপণাস্ত্র নগরী” ধারণাও পর্যাপ্ত সমাধান হয়ে ওঠেনি।
সুরক্ষিত গুদাম বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো গতিশীলতা, ছদ্মবেশ, প্রতারণা ও বিস্তারের অভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। জিবিইউ-৫৭-এর মতো ভেদনকারী অস্ত্র সব কাঠামো ধ্বংস করতে না পারলেও, প্রবেশপথ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অপারেশনাল সক্ষমতা ব্যাহত করতে সক্ষম।
তবুও ইরান ভেঙে পড়েনি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ২০০১ সালে তালেবান এক মাসের মধ্যে কাবুল হারায়, ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন তিন সপ্তাহে বাগদাদ হারান। কিন্তু ইরান শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পরও দ্রুত পাল্টা হামলা চালিয়ে গেছে, এবং মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা তাৎক্ষণিক পতনের ঝুঁকিতে নেই।
এর পেছনে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা—বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব, বাসিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অভিযোজন ক্ষমতা।
পরিশেষে, ইরান একটি সংকর, বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে—বিদেশে মিত্র নেটওয়ার্ক, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো এবং সামুদ্রিক কৌশল। ফলে মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশল যতটা সফল মনে হয়, বাস্তবে ততটা সরল বা সিদ্ধান্তমূলক নয়।
তবে এই যুদ্ধ ইরানের দুর্বলতাও স্পষ্ট করেছে—আকাশ প্রতিরক্ষা, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং আকাশ আধিপত্যের মুখে অবকাঠামো রক্ষা।
শুধু আকাশ থেকে ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো কোনো পূর্ণাঙ্গ কৌশল নয়। ট্রাম্প প্রশাসন যদি পরবর্তী ধাপ—কীভাবে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে—তা নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায়: কৌশলগত পরাজয়ের সঙ্গে সাময়িক সামরিক সাফল্য।
- ডক্টর ওমর আশুর: দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ-এর ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার এবং আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ-এর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইউনিটের পরিচালক। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

