মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত পদক্ষেপের ব্যাপকতা বর্ণনা করা কঠিন। ট্রাম্পের বিপরীত দাবি সত্ত্বেও, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার তার সিদ্ধান্ত এক চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
এক ঝটকায় ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন, ইরানের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছেন, তাঁর ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) সমর্থক গোষ্ঠীকে বিভক্ত করেছেন এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
সম্ভবত গত কয়েক সপ্তাহের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ট্রাম্প—যিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী শক্তিশালী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছেন—তিনি একটি ছোট বিদেশি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো পরিচালনা করার সুযোগ দিচ্ছেন।
মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের অতিরিক্ত প্রভাবের ধারণাকে রিপাবলিকানরা আগে ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিত। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে এবং তা অস্বীকার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের তৃতীয় দিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্লেষকদের দীর্ঘদিনের সন্দেহকেই নিশ্চিত করে বলেন যে, ইসরায়েলই আমেরিকাকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই একটি বড় ধরনের আক্রমণাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্তটি আগেই নানা প্রশ্নের মুখে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে মাত্র তিনটি বাদে বাকি সবগুলোর চেয়ে ছোট একটি দেশের প্রভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এটি আরও বিস্ময়কর।
ইসরায়েল শুধু যুদ্ধ শুরুতেই ভূমিকা রাখেনি, বরং যুদ্ধনীতিও প্রভাবিত করছে বলে মনে হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর জন্য ইরান যুদ্ধ ছিল দীর্ঘদিনের লক্ষ্য—এমন একটি সংঘাত যা ইসরায়েলকে আঞ্চলিক আধিপত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তিনি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি নেতানিয়াহুর এই কৌশলের ফাঁদে পা দেন। জানা যায়, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা থাকুক বা না থাকুক, ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন এবং যুক্তি দিয়েছিলেন যে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় মার্কিন সম্পদও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
১৮ মার্চ ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায়, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং সাউথ পার্সে হামলার পর তা আরও বৃদ্ধি পায়।
|
মাগা বিভক্তি
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত তাঁর মাগা সমর্থকদের মধ্যেও বিভেদ তৈরি করেছে।
টাকার কার্লসন, ক্যান্ডেস ওয়েন্স, মার্জোরি টেইলর গ্রিন, মেগিন কেলি, ম্যাট ওয়ালশ ও নিক ফুয়েন্তেসসহ অনেকেই প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। এটি রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যদিও প্রায় ৮০ শতাংশ রিপাবলিকান এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে, অতীতের তুলনায় এটি কম। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ৮৯ শতাংশ, ২০০১ সালের আফগানিস্তান যুদ্ধে ৯৬ শতাংশ এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধে ৯৩ শতাংশ সমর্থন ছিল।
ভাবমূর্তি সংকট
যুদ্ধকালীন সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে অনেক ক্ষেত্রে অসংগঠিত, অপ্রস্তুত এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দেখা গেছে।
তিনি একাধিকবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, “হয়তো আমাদের সেখানে থাকা উচিত নয়,” যা সমালোচকদের আরও ক্ষুব্ধ করে।
১৪ মার্চ খার্গ দ্বীপে হামলার পর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “মজা করার জন্যও” আবার হামলা চালাতে পারে—যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
১৬ মার্চ তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “কেউ এটা আশা করেনি,” যখন ইরান উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়। অথচ বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই এই ঝুঁকির কথা সতর্ক করেছিলেন।
এটি তার নীতিগত অজ্ঞতা ও অযোগ্যতার ধারণাকে আরও জোরদার করেছে।
‘যুদ্ধবিরোধী’ পরিচয় প্রশ্নে
ট্রাম্প নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিরোধী নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০১৫-১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ইরাক যুদ্ধকে “বড় ভুল” বলেছিলেন।
তিনি অতীতের যুদ্ধগুলোকে “নির্বোধ” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
২০২৪ সালের প্রচারণায় তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “আমি যুদ্ধ শুরু করব না, আমি যুদ্ধ বন্ধ করব।” কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে।
পিছু হটা ও সংকট
হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে ট্রাম্প ন্যাটো মিত্র ও চীনের কাছে সহায়তা চান। পরে তিনি একই সঙ্গে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই—যা নীতিগত অসামঞ্জস্যতা প্রকাশ করে।
২১ মার্চ তিনি ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। কিন্তু ইরানের পাল্টা হুমকির পর তিনি পিছু হটতে বাধ্য হন। যুদ্ধবিরতির বার্তা পাঠানো হলেও ইরান তা উপেক্ষা করে।
উভয় সংকট
ট্রাম্প এখন এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। কিন্তু ইরান দীর্ঘমেয়াদী কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।
যুদ্ধ ইতোমধ্যেই হাজারো হতাহতের ঘটনা, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার একাই বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করছে। লেবাননেও পরিস্থিতি অবনতির দিকে। হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়ানোর পর দেশটিতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ইরানকে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করবে এবং পারমাণবিক কর্মসূচির দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
বৃহত্তর আঞ্চলিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটেছে।
অতীতে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলোকে “পাগলামি” বলেছিলেন। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ হয়তো তার মধ্যেই সবচেয়ে পাগলামিপূর্ণ হিসেবে ইতিহাসে বিবেচিত হতে পারে।
- মোহামাদ এলমাসরি: দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ-এর মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

