মধ্যপ্রাচ্য যখন এক বৃহত্তর সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে, তখন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও মৃতের সংখ্যাকে ঘিরে দৈনিক শিরোনামগুলো তাৎক্ষণিক বিভীষিকা তুলে ধরলেও এর পেছনের গভীরতর কাহিনি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা বৃদ্ধি কয়েক দশক পুরোনো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি দুঃখজনক অধ্যায় মাত্র নয়। এটি সমগ্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ সনদের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরো বেশি অস্তিত্বসংকটপূর্ণ।
এই সংঘাতের ফলে সৃষ্ট মূল সমস্যা শুধু জিসিসি রাষ্ট্রগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নয়। এর আসল সমস্যা হলো কৌশলগত সুযোগের অপচয়—অর্থাৎ, এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক অবকাঠামো, অর্থায়ন ও প্রযুক্তির একটি স্থায়ী কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার ঐতিহাসিক সুযোগ নীরবে হারিয়ে যাওয়া।
প্রথমেই আইনি ও পদ্ধতিগত দিকটি বিবেচনা করা প্রয়োজন, কারণ এটিই পরবর্তী সবকিছুকে কাঠামোবদ্ধ করে।
ইরান যখন প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে, তখন জাতিসংঘে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বলেন, তাঁর দেশ মূলত জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘনের জবাব দিচ্ছে।
তার বক্তব্যে যুক্তি ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রণীত জাতিসংঘ সনদ একটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা।
যখন কোনো রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা চালায়—যেমনটি ২০২৪ সালে দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েল করেছিল—তখন তা ১৯৪৫-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল কাঠামোকেই লঙ্ঘন করে। পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ সেই কাঠামোকে আরও দুর্বল করে।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানান, কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তা কার্যত অকার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়।
বিভাজন ছিল স্পষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সমালোচনা করলেও সরাসরি হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকে।
নিয়মকানুনহীন বিশ্ব
বর্তমানে যা ঘটছে তা কেবল নিয়মের ভাঙন নয়, বরং নিয়মগুলো আদৌ কার্যকর আছে কি না, সে প্রশ্নও উত্থাপন করছে। আমরা কি নতুন এক বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করছি, যেখানে পরাশক্তিগুলো নিয়ম নতুন করে লিখছে, নাকি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে নিয়মগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে?
উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই অনিশ্চয়তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নিয়মহীন বিশ্বে শক্তিশালীরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়, দুর্বলরা তার ফল ভোগ করে।
গত এক দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দুবাই, রিয়াদ ও দোহা নিজেদেরকে শুধু জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।
এই অঞ্চলে ডেটা সেন্টার, এআই গবেষণা কেন্দ্র এবং আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে উঠছে। মাইক্রোসফট সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৫.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস সৌদি আরবে ৫.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।
এই বিনিয়োগগুলো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
যখন জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়ে এবং ‘যুদ্ধ ঝুঁকি’ শুল্ক আরোপ করা হয়, তখন বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা যায়—এ অঞ্চল আর নিরাপদ নয়।
কৌশলগত চাপ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
সংঘাতটি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে লক্ষ্য সরাসরি ভূখণ্ড দখল নয় বরং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইবার হামলা তুলনামূলকভাবে কম খরচে পরিচালিত হলেও এগুলোর প্রতিরোধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এই হামলাগুলো শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, বরং জ্বালানি, সরবরাহব্যবস্থা ও যোগাযোগ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত্তি।
প্রতিটি হামলা, প্রতিটি ব্যাঘাত বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে। ফলে মূলধন অন্যত্র সরে যায়—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার দিকে।
কৌশলগত দ্বন্দ্ব ও নির্ভরতার ঝুঁকি
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সেই নির্ভরতা এখন ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
ইরান শুধু মার্কিন ঘাঁটি নয়, বরং জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। এতে স্পষ্ট বার্তা রয়েছে—মার্কিন উপস্থিতি মানেই ঝুঁকির অংশীদার হওয়া।
উপসাগরীয় দেশগুলো বহু বছর ধরে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রেখেছে, কিন্তু বর্তমান সংঘাত তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
পরিশেষে, উপসাগরীয় অঞ্চল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই অঞ্চলের জন্য স্থিতিশীলতা শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। সংঘাত চলতে থাকলে তারা অন্যত্র সরে যাবে। তাই উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনীতি পুনরুদ্ধার এখনই জরুরি। কারণ সুযোগের জানালা চিরদিন খোলা থাকে না।
ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধে কেউই প্রকৃত বিজয়ী হবে না। বরং উপসাগরীয় অঞ্চল হারাবে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—তার ভবিষ্যৎ।
- নেলসন ওং: চীনের সাংহাই-ভিত্তিক একটি অলাভজনক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সভাপতি এবং মস্কো-ভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের একজন সক্রিয় সদস্য। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

