বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৫ বছর পার হলেও গরিব মৎস্যজীবী ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের একটি শোষণমূলক ঋণ ব্যবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার উদ্যোগ নেই। তাদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দাবি বহু দিনের। এ জন্য আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রয়োজন, যা সরকারের পক্ষে করা অসম্ভব নয়, কিন্তু এখনও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
দেশে কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। কৃষি ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ স্কিমগুলো ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ইত্যাদি ফসলের উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্টভাবে নকশা করা। এ ঋণগুলো মৌসুমি, স্বল্পমেয়াদি এবং জমি বা ফসলকে জামানত হিসেবে ধরে নেয়। সুদের হারও বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় কম।
কিন্তু মৎস্যজীবী ও প্রাণিসম্পদ খামারিরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া কৃষি ফসলের মতো সরল নয়। এখানে বিনিয়োগ ধারাবাহিক, ঝুঁকি বেশি, রোগ ও দুর্যোগের অনিশ্চয়তা থাকে এবং উৎপাদনের চক্রও ফসলের মতো নয়। ফলে প্রচলিত কৃষি ঋণ কাঠামো এই খাতে খাপ খায় না। ব্যাংকগুলো তাই এ খাতকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না।
এই শূন্যস্থানই পূরণ করে ‘দাদন’ নামে এক শোষণমূলক অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। দাদন কেবল প্রাচীন বা অনগ্রসর আর্থিক প্রথা নয়; এটি আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যর্থতার বিকল্প। যখন খামারি বা জেলে ব্যাংক থেকে স্বল্পসুদে ঋণ পায় না, তখন সে বাধ্য হয় মহাজন, আড়তদার বা ফিড ওষুধ ডিলারের কাছে যেতে।
দাদনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো নগদ টাকার বিনিময়ে সরাসরি সুদ না নিয়ে, শোধ পদ্ধতিতেই মুনাফা নিলে উৎপাদককে নিয়ন্ত্রণ করা। নগদ অর্থের বদলে ভবিষ্যতে উৎপাদিত মাছ, ডিম বা মাংস নির্দিষ্ট আড়তে বা নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি নেই, কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা এতই শক্তিশালী যে উৎপাদক তা এড়িয়ে যেতে পারে না।
প্রাণিসম্পদ খাতেও দাদনের বিশেষ রূপ দেখা যায়। গবাদি পশু ও পোলট্রির খাদ্য এবং বাচ্চা সরবরাহ এখন মূলত করপোরেট ফিড ও হ্যাচারি নির্ভর। খামারিরা সরাসরি কোম্পানি থেকে খাদ্য বা বাচ্চা সংগ্রহ করতে পারে না; তাদের যেতে হয় ডিলারের কাছে। ডিলাররা শুধু পণ্য সরবরাহ করে না, ঋণ দেয়, বাজারের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে এবং খামারিকে নির্দিষ্ট উৎপাদন সিদ্ধান্তে বাধ্য করে। ফলস্বরূপ, খামারির উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, কিন্তু বিক্রয়মূল্যের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। রাষ্ট্র যখন এ ব্যবস্থাকে ‘বাজার’ হিসেবে স্বাভাবিক করে, তখন আসলে একটি অসম ক্ষমতার সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
উপকূলীয় অঞ্চল, নদী ও হাওর এলাকায় অধিকাংশ জেলের নিজস্ব মূলধন নেই। ইলিশ আহরণের জেলেরা সবচেয়ে বেশি অসহায়; তাদের নিজের পুঁজি নেই এবং জীবন নির্ভর করছে মাছ ধরার ওপর। কিন্তু জাল, নৌকা, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির ব্যবস্থা কোনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া যায় না। ফলে তারা অনানুষ্ঠানিক ঋণ বা ‘দাদন’ ব্যবস্থার ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। জাতীয় মাছ ইলিশের মৌসুমে এ ব্যবস্থা বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
সহজভাবে বললে, দাদন হলো জেলের মহাজন, আড়তদার বা পাইকারদের দেওয়া আগাম অর্থ বা ঋণ। ইলিশের মৌসুম শুরু হলে আড়তদাররা নৌকা, জাল এবং নদীতে থাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, এমনকি পরিবার চলমান খরচও অগ্রিম হিসেবে জেলেদের দিয়ে দেন। শর্ত একটাই—জেলেরা যে মাছ ধরবেন তা অবশ্যই দাদনদাতার কাছে বিক্রি করতে হবে, যা বাজারমূল্যের তুলনায় কম থাকে।
দাদন মূলত একটি মুনাফার ব্যবসা। জেলেরা তাদের ধৃত মাছ বিক্রয় করে দাদনদাতার মূলধন পরিশোধ করেন, কোনো সরাসরি সুদ দিতে হয় না। তবে দাদন ব্যবসায়ীরা কমিশনের মাধ্যমে লাভ উপার্জন করেন অর্থাৎ, ভবিষ্যতে আহরণকৃত মাছ নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা আড়তে বিক্রি করতে বাধ্য করা হলো দাদনের শর্ত হিসেবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি থাকে না। নগদ অর্থ ছাড়াও জাল, নৌকা, জ্বালানি ইত্যাদির মাধ্যমে দাদন প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, যদি আড়তদাররা আগাম অর্থ না দেন, জেলেদের অন্য কোনো উৎস থেকে পুঁজি পাওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ খাতে কার্যত অনুপস্থিত। ফলে, জেলেরা শোষণমূলক নিয়ম জানলেও তার বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না। জীবিকা টিকিয়ে রাখতে বারবার এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়।
মাঠ পর্যায়ের তথ্য দেখায়, জেলেরা যে আড়তদার থেকে দাদন পান, সেই আড়তেই তাদের আহরণকৃত মাছ উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করতে হয়। বিক্রয়ের পর মোট প্রাপ্ত মূল্যের একটি অংশ আড়তদারকে কমিশন হিসেবে দিতে হয়। কমিশনের হার স্থানভেদে ভিন্ন হয়। নদী-তীরবর্তী আড়তদার সাধারণত ১০ শতাংশের মতো কমিশন নেন। ফলে, জেলেরা মাছ ধরে আনা সত্ত্বেও আর্থিকভাবে লাভবান হন না এবং ঋণের জালে আটকে থাকেন। যদি তারা অন্য কোথাও মাছ বিক্রি করতে পারতেন, কমিশন কম দিতেই পারতেন এবং আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকতেন।
দাদনের পরিমাণ অঞ্চল ও কার্যক্রম অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। ক্ষুদ্র নদীর জেলেরা সাধারণত ১০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন পান। সাগর-জেলেদের ক্ষেত্রে এটি ২ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। দেশের প্রায় ছয় লাখ ইলিশ জেলে যদি প্রত্যেকে ২০ হাজার টাকা করে দাদন নেন, তাহলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দেশের জেলেদের দাদনের পরিমাণ কমপক্ষে হাজার কোটি টাকার মতো।
দাদন দেয়ার বা নেয়ার কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। তবু বছরের পর বছর ধরে এটি নিজস্ব একটি ধরন হিসেবে চলে আসছে। দেখাশোনা কেউ করে না। ২০০৬ সালে কার্যকর হওয়া মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমসিআরএ) আইন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে লাইসেন্স ও অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া কেউ ধার বা ঋণ দিলে তা আইন ভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে। আইনের ৩৫ ধারা অনুযায়ী, কেউ এ বিধান অমান্য করলে সর্বনিম্ন এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বাধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, “ইলিশের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা একে অন্যকে দাদন দিচ্ছেন এবং সেই শর্ত অনুযায়ী জেলেরা মাছ বিক্রি করতে বাধ্য। পাশাপাশি কমিশনও দিতে হয়। অর্থাৎ তারা টাকা ধার দিয়ে সুবিধা নিচ্ছেন। তাই এটি এমসিআরএ আইনের বরখেলাপ এবং দাদন প্রক্রিয়া অবৈধ।”
[সূত্র: প্রথম আলো, ১৪ অক্টোবর ২০২৪]
দাদনের প্রকট সমস্যা সবচেয়ে বেশি টের পান জেলেরা যখন ইলিশ আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন। দাদনের টাকা পরিশোধের জন্যই জেলেরা অনেক সময় মা ইলিশ রক্ষা বা জাটকা মাছ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করতে বাধ্য হন। কারণ আড়তদাররা তাদের দাদন শোধের জন্য মাছ ধরার নিষিদ্ধকালীন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও জেলেদের মাছ ধরতে চাপ দেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যাংক করার উদ্যোগ:
দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে উন্নত করার চেষ্টা চললেও বিদ্যমান দাদন ব্যবসার কারণে জেলেরা তাদের পেশায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব মনে করছে। দাদন ব্যবস্থা যতটা তাৎক্ষণিক পুঁজির সংকট দূর করে, তার চেয়ে বেশি জেলেদের আর্থিক স্বাধীনতা হ্রাস করে। এটি ঋণের এক চক্র তৈরি করে, যেখানে জেলেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন না। বিশেষ করে ইলিশ আহরণকারী প্রায় শতভাগ জেলে এই দাদনের ওপর নির্ভরশীল। ন্যায্য বাজারদর না পাওয়া, উচ্চ কমিশন, বিক্রয় স্বাধীনতার অভাব—এসবই এই ব্যবস্থার প্রধান নেতিবাচক প্রভাব। মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সহজ শর্তে (জামানতবিহীন) ব্যাংক ঋণ, সমবায়ভিত্তিক অর্থায়ন এবং সরকারি সহায়তা জরুরি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাংকের প্রস্তাব
২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ তারিখে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাংক’ করার প্রস্তাব পেশ করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এর ৬০ শতাংশ ‘শস্য ও ফসল’ খাতের জন্য বরাদ্দ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ঋণের লক্ষ্য যথাক্রমে মাত্র ১৩ ও ১৫ শতাংশ। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ঋণ বিতরণ এবং সমন্বয়ও কার্যকরভাবে সম্ভব নয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদন প্রক্রিয়া কৃষির মতো সরল নয়। জেলেদের বা খামারিদের জামানত দেওয়ার মতো সম্পদ নেই। অথচ তাদের আহরণ বা উৎপাদনই মূল গ্যারান্টি। এই একই আহরণকে কেন্দ্র করে দাদন ব্যবসা টিকে আছে। তাহলে কেন সরকার ঝুঁকি নিতে পারবে না? কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ঋণ দেয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু এ কার্যক্রম যথেষ্ট কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয়তা: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ঋণের সুবিধা হলে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
- গুণগত মানসম্পন্ন মৎস্য ও প্রাণিজ পণ্যের উৎপাদন, বাজারজাত ও রফতানি বৃদ্ধি,
- প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বহুমুখীকরণ,
- মানসম্পন্ন মৎস্য ও পশুখাদ্য উৎপাদন,
- দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণ এবং কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন,
- সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা,
- মৎস্য খাতে সুনীল অর্থনীতির বিকাশ।
ইতিমধ্যে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে প্রকৃত চাষী, জেলে ও খামারিদের জন্য বিশেষায়িত ঋণের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে। এটি শুধুমাত্র মৎস্যজীবীর জন্য নয়; প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে যুক্ত খামারিদের জন্যও অপরিহার্য। সঠিক ঋণ বিতরণের মাধ্যমে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সরকারি ঋণের বৈষম্য দূরীকরণ এবং দারিদ্র্য হ্রাস সম্ভব।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১১ নভেম্বর, ২০২৪ তারিখে ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাংক’ চালুর যৌক্তিকতা একটি সারসংক্ষেপে প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে মতামত বিনিময় করা হয়েছে। ফলে এই বিশেষায়িত ব্যাংক চালু করার উদ্যোগ এখন কিছুটা এগিয়ে আছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুধুমাত্র লাখ লাখ জেলে ও খামারিই উপকৃত হবেন না; দেশের মৎস্য আহরণ, চাষ ও গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে জনগণের জন্য প্রাপ্য আমিষের সরবরাহে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
- ফরিদা আখতার: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা।

