দেশের জ্বালানি খাতে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় ‘প্যানিক বায়িং’ এবং অবৈধ মজুতের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই আচরণ বাজার পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থির করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দেশের জ্বালানি খাতে চলমান অস্থিরতা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান সংকটের মূল কারণ হলো সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি এবং মূল্য ওঠানামা। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এবং সঠিক তথ্যের অভাব এই পরিস্থিতিকে তীব্র করছে। যদি অবিলম্বে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে সংকট আরও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও জানান, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো সতর্কতা বজায় রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে মূল্য স্থিতিশীল থাকে এবং সাধারণ মানুষ যাতে জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত চাপ অনুভব না করে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি মজুদ করা বা আতঙ্কিত হয়ে হুটহাট কেনাকাটা করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
ড. হোসেন আশা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সঠিক পরিকল্পনা ও সংযমী মনোভাব থাকলে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতের জন্য প্রয়োজন সতর্ক নজরদারি, স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সচেতনতার মাধ্যমে জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়া।
শুধুমাত্র সরকার নয়, দেশের প্রতিটি ব্যবহারকারী এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সমস্যা স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন।
প্রশ্ন: দেশে তেলের ‘প্যানিক বায়িং’ চলছে। ভবিষ্যতে তেল না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে অতিরিক্ত তেল কিনছেন। জনগণের সচেতনতায় এই মুহূর্তে করণীয় কী?
ড. ইজাজ হোসেন: সচেতনতার দরকার। সচেতনতার অভাবেই তো… আমি জানি না কতখানি সত্যি যে তারা প্যানিক। একটা হচ্ছে প্যানিক। আরেকটা হচ্ছে স্বার্থপরতা। আমারটা হলেই চললো, আমি পেয়ে যাচ্ছি—এরকম চিন্তা-ভাবনা করছে অনেকে, যা ভোগাচ্ছে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীও জনগণের কাছে একটা বার্তা দিলে ভালো হয় যে আপনারা আতঙ্কিত হবেন না, আমরা এই চেষ্টা করছি। আমরা দেখছি টিভিতে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সর্বোচ্চ লেভেল থেকে দিতে হবে। মন্ত্রী দিলেও হবে না, প্রধানমন্ত্রীকে দিতে হবে, আমরা চেষ্টা করছি আপনাদের অসুবিধা না হয়, সচেতনতা বাড়াতে হবে।
প্রশ্ন: সরকার ঘোষণা দিয়েছে অবৈধ তেলের মজুত যদি কেউ ধরিয়ে দেয় তাহলে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। অভিযানও অব্যাহত আছে, তারপরও বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে অবৈধ তেল মজুত করে রাখা হচ্ছে। সরকার কেন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না?
ড. ইজাজ হোসেন: আমিও একটু আশ্চর্য হচ্ছি যে, সরকার কেন আরও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বাস্তবে আইনটা অবশ্য অত কঠোর নয়। শাস্তিগুলো খুবই কম। কারণ এগুলো হচ্ছে সাধারণ সময়ে যারা মজুত করে তখন এটা অন্যভাবে দেখা হয়, যে এটার মধ্যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার ভয় থাকে কি না অথবা ওরা ভেজাল মেশালো কি না! কিন্তু ক্রাইসিসের সময় এটা তো অন্যরকম। একেবারে আমাদের আইনটা সংকটের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ বা উপযুক্ত নয়।
যারা অবৈধ মজুত করছে তাদের আইনের আওতায় এনে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, যাতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। কারণ এখন আমরা একটা সংকটের মধ্যে আছি, অবৈধ মজুত এ সংকটটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা বড় ক্রাইম।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের কী কী আগাম পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?
ড. ইজাজ হোসেন: আমাদের ডিজেল ইম্পোর্ট করতে হয় মিলিয়ন টনের বেশি, এটা মোটামুটি সম্পূর্ণটাই ইম্পোর্টেড। আমাদের পেট্রোল আর অকটেনের ব্যবহার মিলিয়ন টনেরও কম, তার মধ্যে ৭০ শতাংশই আমাদের দেশে উৎপাদন হয়।
পাম্পে কোনো সাধারণ সময়ে আমি যতখানি ভিড় পাই, ঠিক তেমনি আমি তেল ভরে নিয়ে চলে এলাম। আর উল্টা দিকে দেখলাম যে বিশাল লাইন অকটেন-পেট্রোলের জন্য। এরপর তেল দিচ্ছে খুবই ধীরগতিতে। সাধারণ সময়ে একটু এদিক-ওদিক হলেই পাম্পে মোটারসাইকেলে লম্বা লাইন লেগে যায়।
আর এখন তো অবস্থা একটু খারাপ। আমার মনে হয় সরকার ডিজেল যেহেতু সামাল দিতে পারছে, সেহেতু পেট্রোল-অকটেন পরিস্থিতিও সামাল দিতে পারবে। সরকারের সবগুলো অরগ্যানকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সূত্র: জাগো নিউজ

