ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনের আগে দেড় বছর দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল। তবে এই অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার কাজে ব্যস্ত থাকায় আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ খণ্ড বীমা খাত প্রয়োজনীয় সংস্কার থেকে বঞ্চিত ছিল।
বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা সরকারের হাতে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট রয়েছে। সেই সঙ্গে অন্যান্য খাতের মতো বীমার খাতেও জরুরি সংস্কার এবং দিকনির্দেশনার প্রয়োজন বেড়েছে। বাংলাদেশের বীমা খাত বর্তমানে অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে, সম্ভাবনাময় এই খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখতে পারে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে বীমা খাত দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বেকারত্ব হ্রাস, দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনমান উন্নয়নসহ সামগ্রিক দেশজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে দুঃখজনক বিষয়, এই খাত কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান মাত্র ০.৪ শতাংশেরও নিচে। এই একক পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে খাতটির ভঙ্গুরতা ও স্থবিরতা। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে বীমার অবদান অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের জিডিপিতে বীমার অবদান ৪ শতাংশের ওপরে, আর উন্নত দেশে এই হার ৮–১০ শতাংশের মধ্যে।
যদিও সাম্প্রতিক অতীতে এই হার সামান্য বেশি ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি নির্দেশ করে, বীমা খাতের কাঙ্ক্ষিত অবদান ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। তাই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই খাতকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে প্রয়োজন যথাযথ সংস্কার ও নীতি নির্ধারণ।
যেকোনো দেশের অর্থনীতি যখন উন্নত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই বীমা খাতের অবদানও বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন পায়, আর দেশের প্রতিটি খাতে সম্পদ ও দায়ের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ঝুঁকির মাত্রা ও বহুমুখিতাও বৃদ্ধি পায়। সেই প্রেক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশও স্বাভাবিকভাবে ঘটে।
উৎপাদনশীল খাতের পাশাপাশি সেবা খাতও দ্রুত বিকাশ লাভ করে। সেবা খাতের প্রাথমিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ব্যাংক ও বীমা খাত গুরুত্ব পায়। উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকিও বেশি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো উন্নয়নশীল দেশে ব্যাপক অবকাঠামোগত কাজ হয়—রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, অফিস, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল নির্মাণ। এসব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত কাঁচামাল দেশের ভেতর থেকে উৎপাদিত হতে পারে অথবা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেক্ষেত্রে দেশের কলকারখানা বিভিন্ন ঝুঁকিতে পড়ে, আর আমদানির ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং তাদের কার্যপরিধি বিস্তৃত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বীমা খাতের বিকাশ অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান সরকার তাদের ইশতাহারে আগামী ১০ বছরে দেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ইউএস ডলারের পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ১০ বছরের মধ্যে অর্থনীতি দ্বিগুণ করতে হলে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ হতে হবে। যদিও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ, যুদ্ধ ও সংকোচনশীল পরিস্থিতি এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে কঠিন করে তুলেছে, তবুও অসম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মতো বীমা খাতের বিস্তারও জরুরি। দেশের উৎপাদন ও জিডিপিতে বীমার অবদান প্রায় ৪ শতাংশের মধ্যে উন্নীত করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ, বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনে ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারকে বীমা খাতে বিদ্যমান অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।
বাংলাদেশের বীমা খাত নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। এই সব সমস্যা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে সমস্যাগুলো আগে চিহ্নিত করা হলে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সমস্যা সমাধানের উৎকৃষ্ট উপায় হলো চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য আনয়ন। বীমা খাতকে গণমুখী সেবাদানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হলে চাহিদা ও জোগান উভয়দিকের সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান প্রণয়ন অপরিহার্য।
বাংলাদেশের বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আস্থার সংকট। বীমা খাতের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষ—বীমাকারক, বীমাগ্রহীতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারের অন্যান্য মহল এবং সাধারণ জনগণ—এ দেশের বীমা সেবা নিয়ে আস্থা হারিয়েছে। এ আস্থা রাতারাতি তৈরি হয়নি; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে বীমাকারীর সঙ্গে বীমাগ্রহীতার আস্থার সংকটের মূল কারণ হলো বীমা দাবির সময়মতো পরিশোধ না করা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে নন-লাইফ বীমা খাতে মোট বকেয়া দাবির পরিমাণ প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে মোট দাবির মাত্র ৯.৩৭ শতাংশই নিষ্পত্তি হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২টি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে, যার মধ্যে ৪৬টি নন-লাইফ এবং বাকিগুলো জীবনবীমা প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানিও রয়েছে।
তবে শুধু নন-লাইফ খাতের ক্ষেত্রে বীমা দাবির অনিষ্পন্ন অবস্থার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রায় ৯০ শতাংশ দাবি অনিষ্পন্ন থাকায় গ্রাহকের আস্থা বিপন্ন হচ্ছে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব হবে দ্রুত কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়ে বকেয়া দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা, যাতে জনগণ আবারও বীমা খাতে আস্থা ফিরে পায়।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো দক্ষ জনবল ঘাটতি। দক্ষ জনবল তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিগত সরকারগুলো গ্রহণ করেনি। দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বীমা শিক্ষা প্রায় অবহেলিত। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বীমা বিষয় স্বতন্ত্রভাবে নেই। কোথাও কোথাও অন্য বিষয় সঙ্গে সংযুক্ত দু’একটি কোর্স থাকলেও তা যুগের চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
এ অবস্থায়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা শিক্ষা স্বতন্ত্রভাবে চালু করা জরুরি। দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষক তৈরি করতে হবে এবং বিদ্যমান জনবলকে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যকর সেবা দিতে সক্ষম করা যেতে পারে। দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে, সীমিত হলেও বীমা শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র বিষয় চালু করতে হবে।
বাংলাদেশে বীমা খাতে বেতন বৈষম্য প্রকট। সমসাময়িক এবং সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বীমা খাতে চাকরির বেতন তুলনামূলকভাবে কম। যদিও কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এটি একটি সমস্যা। বীমা ব্যবসার সীমিত বিস্তারের কারণে অনেক কোম্পানি অতিরিক্ত লাভ করতে পারে না। ফলে কম লাভ বা লোকসানজনিত কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি বেতনের মাধ্যমে জনবল সংগ্রহ করতে অক্ষম।
বীমা শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উচিত হবে সম্মানজনক চাকরি নিশ্চিত করা। বীমা খাতে চাকরি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বেতন-ভাতা যুগোপযোগী করতে এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এভাবে বীমা খাত আগামী প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় হবে, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী বীমা শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হবে, আর বর্তমানে দক্ষ জনবল ঘাটতি পূরণ হবে।
বীমা একটি বিশেষায়িত শিল্প। এখানে হিসাব-নিকাশের কাজ ভিন্ন এবং বিশেষজ্ঞ একচ্যুয়ারি প্রয়োজন। একজন একচ্যুয়ারি ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যানের জ্ঞানে দক্ষ হতে হয়। তবে বাংলাদেশে দক্ষ একচ্যুয়ারির সংখ্যা খুবই নগণ্য। বিদেশে অনেক বাংলাদেশী একচ্যুয়ারি সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন, কিন্তু দেশে তারা অনীহা দেখান। সরকার প্রয়োজনে দেশে বা বিদেশে একচ্যুয়ারি শিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারে।
অন্য সমস্যা হলো, বীমা কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী নয়। ঝুঁকি ব্যবস্থাপক হয়েও যদি কোম্পানি ঝুঁকি নিতে না পারে, তাহলে ব্যবসা সম্প্রসারণ হবে কীভাবে? দেশে সব খাত—জেলে, কামার, গাড়িচালক, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষক, শিল্প শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি চাকুরে, স্কুল-কলেজ, কলেজ-ও বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা, অবকাঠামো, আমদানি-রফতানি—সবকেই বীমার আওতায় আনা দরকার। এজন্য স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। গণমুখী বীমা সেবা চালু করতে, যেসব কোম্পানি অগ্রণী ভূমিকা নেবে তাদের প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। বেসরকারি খাত না এগোলে, সরকারি বীমা কোম্পানির মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় বীমা পৌঁছে দিতে হবে।
সর্বশেষ, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কার জরুরি। বেসরকারি ও রাষ্ট্রীয় বীমা কোম্পানিতে সুশাসনের ঘাটতি প্রকট। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিকে প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। নিয়োগ, বদলি, প্রমোশনসহ কোনো পর্যায়ে দুর্নীতি, রাজনীতি বা স্বজনপ্রীতি চলবে না। জনগণের প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক ও সেবামুখী ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের বীমা খাতের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। সংস্থার কর্তা ও কর্মকর্তা যারা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তাদের যথেষ্ট প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। আইনি সংস্কার কেবল তৈরি করলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগও নির্মোহভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
সাথে সঙ্গে গবেষণা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। দেশের বীমা খাতের সমস্যা দীর্ঘদিনের—তথ্যের ঘাটতি, অবাধ প্রবাহে বাধা, কারসাজিমূলক আর্থিক বিবরণী তৈরি করে লাভ-লোকসান দেখানো ইত্যাদি অভিযোগ বহুদিন ধরে বিদ্যমান। জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ নীতি অনুসরণ করতে হবে।
ক্ষমতাসীন সরকারের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে বীমা খাতের সংস্কার অপরিহার্য। যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করে সঠিক সময়ে পদায়ন করলে দেশের বীমা খাত শুধুমাত্র স্থিতিশীল হবে না, বরং জনবান্ধব সরকারের লক্ষ্য পূরণেও সহায়ক হবে।
- ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান।

