একটি জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষা ব্যবস্থার মান এবং সময়োপযোগিতার ওপর। সঠিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি চিন্তা করার ক্ষমতা, নৈতিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার মূল ভিত্তি। শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিকরা শুধু জ্ঞান অর্জন করে না, তারা সেই জ্ঞান ব্যবহার করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে।
যদি শিক্ষা বাস্তব জীবনের প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, তা হলে নাগরিকরা আত্মনির্ভর, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী হয়ে ওঠে। সময়োপযোগী শিক্ষা তরুণদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানযোগ্য করে এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস জোগায়। পাশাপাশি এটি সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ তৈরি করে। আধুনিক অর্থনীতি শিক্ষা নাগরিককে পরিবর্তনশীল বিশ্বে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেয়। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের মধ্যে অর্থনীতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনীতি শিক্ষায় দুটি বড় সমস্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো মাধ্যমিক পর্যায়ে এ বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষার সঠিক ভিত্তি তৈরি হয় না। দ্বিতীয়টি হলো, পাঠ্যক্রমে প্রাধান্য পায় পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক ধারণা। এ অঞ্চলের উদ্ভাবনী কৌশল ও অভিজ্ঞতা, যেমন চীন, জাপান, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরের উদাহরণ, প্রায় উপেক্ষিত থাকে।
বর্তমান জাতীয় শিক্ষাক্রমে মাধ্যমিক পর্যায়ে সবার জন্য অর্থনীতি বাধ্যতামূলক নয়। নবম ও দশম শ্রেণীতে এটি মূলত ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায় পেরিয়ে যায় মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার, বাজেট, করব্যবস্থা বা ব্যাংকিং সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা ছাড়াই। এছাড়া ডিজিটাল ফিন্যান্স, ই-কমার্স ও স্টার্টআপ, অনলাইন আর্থিক লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন প্রতারণা ও ঋণঝুঁকি—এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও পাঠ্যক্রমে কাঠামোবদ্ধভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ঘাটতি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অজ্ঞতার কারণে নয়, বরং সমগ্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই মাধ্যমিক পর্যায়ে অর্থনীতি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করা সময়ের দাবি।
বিগত দশকে পৃথিবীজুড়ে তথ্য-প্রযুক্তিতে বিপ্লবী পরিবর্তন এসেছে। চলতি দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার আর ব্যবহার অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রকে দ্রুত পরিবর্তিত করছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এশিয়ার দেশগুলোতেও ডিজিটাল ফিন্যান্স, ই-কমার্স ও স্টার্টআপ খাতের সম্প্রসারণ চোখে পড়ার মতো।
এই বাস্তবতায় তরুণদের আর্থিক অজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়; এটি সমষ্টিগত অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালে এশিয়ায় ফিনটেক বা প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক বাজারের প্রায় অর্ধেক অংশ দখল করছে। চীনে মোবাইল পেমেন্ট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রায় ৮৮ শতাংশ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করছে। এর ফলে সেখানকার জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক আচরণই বদলে গেছে।
সিঙ্গাপুরে ২০২৫ সালে প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ দৈনন্দিন লেনদেনে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করছে। জাপান ২০২২ সাল থেকে স্কুল পর্যায়ে শেয়ার, বন্ড ও বিনিয়োগ শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করেছে, যাতে তরুণরা বাস্তব আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মশক্তি তৈরি করেছে। ফলে উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আধুনিক অর্থনৈতিক জ্ঞান কেবল অর্থনীতিবিদ তৈরির জন্য নয়। এটি ডিজিটাল যুগে দক্ষ, স্বনির্ভর ও উদ্ভাবনী জনগোষ্ঠী গঠনের জন্য অপরিহার্য। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা যদি সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি, উদ্যোক্তা মানসিকতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা না পায়, তবে তারা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৌড়ে প্রাসঙ্গিক থাকতে পারবে না।
অতএব, তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক শিক্ষা এখন আর ঐচ্ছিক নয়। এটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য জীবনদক্ষতা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত একটি প্রস্তাব হলো, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ‘আর্থিক শিক্ষা ও মৌলিক অর্থনীতি’ শীর্ষক একটি বাধ্যতামূলক বিষয় চালু করা। এটি আলাদা পূর্ণাঙ্গ বিষয় হিসেবে থাকলে ভালো হয়। তবে তা না হলেও নির্দিষ্ট সময় ও মূল্যায়ন কাঠামোর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব।
নতুন পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে চাহিদা-যোগান, মুদ্রাস্ফীতি, করব্যবস্থা, ব্যক্তিগত বাজেট, সঞ্চয় বনাম বিনিয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল ফিন্যান্স, ই-কমার্স ও স্টার্টআপ খাত, ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পরিকল্পনা। সিঙ্গাপুরের উদাহরণ অনুসারে মাধ্যমিক পর্যায়ে সামাজিক শিক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক ধারণা বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক বানিজ্য, বাজার কাঠামো ও নীতির প্রভাব বিশ্লেষণ শেখার সুযোগ পাবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, অর্থনীতি বিষয়টি নাগরিক শিক্ষার অংশ হিসেবে এবং শিল্পনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বিতভাবে শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে দ্রুত শিল্পায়নের সময়ে দক্ষ ও অর্থনৈতিকভাবে সচেতন কর্মশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি কেবল পরীক্ষাভিত্তিক সাফল্য চাই, নাকি অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই? যদি দ্বিতীয়টি আমাদের লক্ষ্য হয়, তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে আধুনিক অর্থনীতি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায় প্রায়শই অর্থনীতিতে ক্রেতা-বিক্রেতা স্বাধীন ও তথ্যপ্রাপ্তি পূর্ণ বলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে কৃষিপণ্য বা ক্ষুদ্র খুচরা বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী, তথ্য বৈষম্য ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। শ্রমবাজার বিশ্লেষণেও পশ্চিমা দেশের আনুষ্ঠানিক চাকরিভিত্তিক অর্থনীতি ধরে শেখানো হলেও বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে সামাজিক সম্পর্ক, মৌসুমি কাজ এবং পারিবারিক শ্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাঠ্যবইয়ে সুদের হার ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা হয় উন্নত দেশের ব্যাংকভিত্তিক অর্থব্যবস্থা কেন্দ্র করে, অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষুদ্রঋণ, সমবায় ও অনানুষ্ঠানিক ধার-দেনা বড় ভূমিকা রাখে। কল্যাণ রাষ্ট্রভিত্তিক করনীতি বিশ্লেষণেও ইউরোপীয় প্রেক্ষাপট দেওয়া হলেও বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো ভ্যাট ও পরোক্ষ করনির্ভর, যা ভিন্ন সামাজিক প্রভাব তৈরি করে। ফলে শিক্ষার্থীরা তত্ত্ব শেখে, কিন্তু স্থানীয় বাস্তবতায় প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থনীতি বা গ্রামীণ বাজার কাঠামো পর্যাপ্তভাবে বোঝার সুযোগ পায় না। এতে অর্থনীতি বিষয়টি অনেক সময় বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন একাডেমিক জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি শিক্ষাকে এশীয় অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের সমাজ ও অর্থনীতিকে বোঝার মাধ্যমে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এজন্য প্রথমত, পাঠ্যসূচির বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকমন্ডলীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। যতদিন না আমরা স্থানীয় অভিজ্ঞতালব্ধ অর্থনৈতিক জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিশ্চিত করি, ততদিন এসব বিষয়ে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের পথও উন্মুক্ত হবে না।
- নূর ই আলম: লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

