আধুনিক আইন একটি সভ্য সমাজের মৌলিক নৈতিক নীতিমালার প্রতি অঙ্গীকার এবং এর সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও সমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে বলে মনে করা হয়।
আইনকে অবশ্যই সমাজের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে, কী অনুমোদিত ও কী নিষিদ্ধ তা নির্দেশ করতে হবে এবং মানবাধিকারকে সম্মান করে এমন একটি বিশ্বের চিত্র তুলে ধরতে হবে।
ইসরায়েলি নেসেট এমন একটি আইন প্রণয়ন করে এই নীতিগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, যা অনুযায়ী ‘সন্ত্রাসী’ কর্মকাণ্ডে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত যেকোনো ফিলিস্তিনির ওপর মৃত্যুদণ্ড আরোপ করা হয়েছে।
ইসরায়েল উগ্র-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের মনোভাব গ্রহণ করেছে এবং যাদের জন্য সে দায়বদ্ধ—তারা নাগরিক হোক বা দখলদারিত্বের অধীনে থাকা প্রজা—তাদের সুরক্ষার কর্তব্য পরিত্যাগ করেছে। এর মাধ্যমে দেশটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে আইনের ব্যবহারকে বৈধতা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে মৃত্যুদণ্ড হ্রাস ও বিলোপের দিকে একটি সুস্পষ্ট বৈশ্বিক প্রবণতা দেখা গেছে। বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশই এই উপলব্ধির ভিত্তিতে আইনগতভাবে বা কার্যত মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করেছে যে, এটি একটি নিষ্ঠুর, অপরিবর্তনীয় শাস্তি যা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
যেহেতু আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রগুলোকে এই শাস্তির ব্যবহার পরিত্যাগ করতে উৎসাহিত করছে, তাই ইসরায়েলে এর পুনঃপ্রবর্তন আধুনিক বিশ্বের স্বীকৃত রীতিনীতি থেকে একটি মৌলিক পশ্চাদপসরণকে চিহ্নিত করে।
আইনটি অগ্রসর করার ক্ষেত্রে, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি মৃত্যুদণ্ড বিলের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২,০০০-এরও বেশি আপত্তি খারিজ করে দিয়েছে। বেন গভির বলেন, “আমরা ঐতিহাসিক সুযোগ ও বিরাট সাফল্যের এক সন্ধিক্ষণে রয়েছি।”
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন
আইনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, হামলা প্রতিরোধ করা এবং অন্তর্ঘাতমূলক কাজের প্রতিশোধ গ্রহণ করা। কিন্তু বিশ্বব্যাপী গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে কারাদণ্ডের চেয়ে মৃত্যুদণ্ড সম্ভাব্য অপরাধীদের বেশি নিবৃত্ত করে, কিংবা এর সাথে অপরাধ হ্রাসের কোনো সম্পর্কও নেই। উপরন্তু, আদর্শগত কারণে পরিচালিত অভিযানের অপরাধীরা হয়তো আগে থেকেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।
নতুন ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী, সামরিক আদালতে মারাত্মক ‘সন্ত্রাসবাদের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের ‘বাধ্যতামূলক’ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অত্যন্ত সীমিত ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এটিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তন করা যেতে পারে।
বাস্তবে, অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের বিচার শুধুমাত্র সামরিক আদালতে করা হয়, অন্যদিকে বসতি স্থাপনকারীসহ ইসরায়েলি নাগরিকদের বিচার বেসামরিক আদালতে করা হয়।
নতুন আইনটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেসব দেশ এখনও মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করেনি, তাদের কেবল “সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের” ক্ষেত্রেই এটি আরোপ করতে হবে। এই চুক্তির দ্বিতীয় ঐচ্ছিক প্রোটোকলের সুস্পষ্ট লক্ষ্য হলো মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করা।
সুতরাং ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ সভ্য দেশগুলোর গৃহীত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকার থেকে এক ধরনের পশ্চাদপসরণ।
ইসরায়েলি বেসামরিক আদালতগুলোতে নতুন আইন অনুযায়ী, “ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার লক্ষ্যে” ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের মৃত্যু ঘটানো ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। অস্পষ্ট ভাষা থাকা সত্ত্বেও, এটা স্পষ্ট যে এই সংজ্ঞার আওতায় কেবল ফিলিস্তিনি অভিযুক্তরাই পড়বেন—তারা ইসরায়েলের নাগরিক হোন বা অধিকৃত অঞ্চলের বাসিন্দা।
এর কারণ হলো, ইসরায়েলি ইহুদিদের দ্বারা সংঘটিত সন্ত্রাসবাদ, যা প্রায়শই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়—জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২,৬৬০টি বসতি স্থাপনকারী হামলা সংঘটিত হয়েছে—সাধারণত “ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করার” উদ্দেশ্যে চালানো হয় না।
বেসামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডকে বিবেচনামূলক সিদ্ধান্তে পরিণত করার মাধ্যমে ইসরায়েলি আইনপ্রণেতারা এটা নিশ্চিত করছেন যে, কোনো ইহুদি নাগরিক ইসরায়েলের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে হামলা চালানোর জন্য দোষী সাব্যস্ত হলেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না।
একটি শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করা
অধিকৃত ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি পূর্বনির্ধারিত বিকল্প হিসেবে মৃত্যুদণ্ড, জাতীয়-জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি বর্ণবাদী শাস্তি হিসেবে কাজ করবে, যা ফিলিস্তিনিদের জীবন, মর্যাদা, যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া এবং সমতার অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করবে।
এই আইনটি এমন একটি স্তরবিন্যাস তৈরি করে, যার অধীনে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সহিংস জাতীয়তাবাদকে অন্য যেকোনো ধরনের সহিংসতার চেয়ে, এমনকি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের জাতীয়তাবাদী সহিংসতার চেয়েও- অধিক গুরুতর বলে গণ্য করা হয়।
সামরিক আদালতে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড এবং বেসামরিক আদালতে বিবেচনামূলক মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে পার্থক্যটি মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যা এই মর্মে নিশ্চয়তা দেয় যে আইনের দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান। জাতীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে দুটি ভিন্ন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এই নীতির একটি চরম লঙ্ঘন এবং এটি বর্ণবৈষম্যের শামিল হতে পারে।
নতুন আইনটি যেকোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী, যা হলো বিচার বিভাগকে বিচক্ষণতা প্রয়োগ এবং উপযুক্ত শাস্তি আরোপের স্বাধীনতা প্রদান করা। এটি সামরিক আদালতকে অধিকৃত ফিলিস্তিনিদের ওপর মৃত্যুদণ্ড আরোপ করতে বাধ্য করে, যেখানে কেবল অসাধারণ পরিস্থিতিতেই ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।
এই ধরনের মামলায় মৃত্যুদণ্ড বাধ্যতামূলক করা হলে তা আদালতকে অপরাধীর দণ্ড হ্রাসকারী পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে, ফলে শাস্তিটি স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়ে এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘিত হয়।
অধিকন্তু, এই আইনের অধীনে সামরিক আদালতে কোনো অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাকে ক্ষমা করা সম্ভব হবে না। এটি চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৭৫ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যেখানে বলা হয়েছে যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের “ক্ষমা বা দণ্ড স্থগিতের জন্য আবেদন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না”।
এছাড়াও, মৃত্যুদণ্ড জারি করার জন্য সর্বসম্মতির পরিবর্তে বিচারিক প্যানেলের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট হবে এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অনুরোধ না করলেও এই শাস্তি আরোপ করা যেতে পারে।
বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা
জীবন ও সমতার অধিকারের ওপর এই ভয়াবহ ও অপূরণীয় আঘাতের পাশাপাশি, নতুন আইনটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পরিবারকে সাক্ষাতের সুযোগ ছাড়া একটি পৃথক কেন্দ্রে রাখার এবং আইনি অধিকার প্রাপ্তির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিধান করেছে।
দণ্ডাদেশের ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে, যদিও এই সময়সীমাকে সমর্থন করার মতো কোনো জরুরি প্রয়োজন নেই। এটি বন্দীর যথাযথ বিচার পাওয়ার অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করে, যার মধ্যে পুনর্বিচারের জন্য সম্ভাব্য আবেদনের সুযোগও অন্তর্ভুক্ত, যা আন্তর্জাতিক আইনি নিয়ম অনুসারে অন্যান্য দেশে প্রচলিত।
তাছাড়া, ইসরায়েলের বিচার ব্যবস্থা এবং বিশেষ করে অধিকৃত অঞ্চলের সামরিক আদালতগুলো ফিলিস্তিনিদের প্রতি বৈষম্য করার জন্য কুখ্যাত।
একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঝুঁকিই এই নিষ্ঠুর ও চূড়ান্ত শাস্তি প্রত্যাখ্যান করার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০ জনেরও বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে সংখ্যালঘু এবং দুর্বল গোষ্ঠীগুলোর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মৃত্যুদণ্ড আরোপ করা হয় এবং স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলো ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে এটি ব্যবহার করে। এই সবকিছুর ভিত্তিতে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশ আইনগতভাবে বা কার্যত মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করার পথ বেছে নিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসরায়েলি আইন এবং গণতান্ত্রিক নীতির ওপর এর লঙ্ঘনের বিষয়ে তাদের “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করে একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছেন। কিন্তু ইসরায়েলের নীতি নির্ধারকদের ওপর এই ধরনের অনুভূতির তেমন কোনো প্রভাব আছে বলে মনে হয় না।
- হুসেইন আবু হুসেইন: উম্ম আল-ফাহমের একজন বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

