জামালপুরের খলিলহাটা এলাকায় একটি ছোট ঘটনা শোনার পর মনে হয় যেন গ্রামের সাধারণ মানুষদের জীবনে কতটা নিষ্ঠুর বাস্তব থাকে। অভিযোগটি ছিল ছেলে গরু চুরির চেষ্টা করেছে। তবে সেটি কখনও প্রমাণিত হয়নি কিন্তু সেই অপ্রমাণিত অভিযোগের কারণে গ্রাম্য মাতবররা যুবককে ধরতে না পেরে তার মা-বাবাকে আটক করে।
এরপর বসানো হয় সালিশ। সালিশের সময়ে মা-বাবাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। অপমান সহ্য করতে না পেরে বাড়ি ফিরে মা জোসনা বানু গলায় রশি বেঁধে আত্মহত্যা করেন। ঘটনা গত ২৬ মার্চ প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জানা গেছে।
খবরটি ছোট হলেও ওজন অনেক বড়। একজন অসহায় মায়ের আত্মহত্যা সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি শুধু গ্রামীণ সালিশের সমস্যা নয়। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও একই আচরণের অভিযোগের মধ্যে থাকে। আসামিকে না পেয়ে তারা পরিবারের অন্য সদস্যকে ধরতে বাধ্য হয়।
মার্চের প্রথম সপ্তাহে নওগাঁর মহাদেবপুরে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরোয়ানাভুক্ত আসামি এমরানকে গ্রেপ্তারের জন্য হাতুড় ইউনিয়নের মালাহার উত্তরপাড়া গ্রামে অভিযান চালায়। পুলিশ উপস্থিতি টের পেয়ে এমরান পালিয়ে যান। এরপর তাঁর বাবা আব্দুল হামিদকে (৬৬) ধরে আনার চেষ্টা করা হয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে লাথি মেরে ফেলে, ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান (সমকাল, ৬ মার্চ, ২০২৬)।
নিঃসন্দেহে এই ধরনের ঘটনা মানবাধিকার ও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে সন্তানের অপরাধের জন্য বাবা-মাকে শাস্তি দেওয়া হয় না। এমন ঘটলেও তা তদন্ত ও বিচারের আওতায় আসে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ঘটনায় নওগাঁর কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
১৯৭১ সালের ইতিহাস মনে করালে, তখনও একই ধরনের অত্যাচার চলত। তখন ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে–এর অভিযোগে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদাররা বাবা-মাকে ধরে নিয়ে যেত। স্বাধীন দেশে এসেও একুশ শতকে একই অন্ধকার চলছে। সন্তানের অপরাধের জন্য পরিবারের সদস্যকে শাস্তি দেওয়া এখনো থামেনি।
কয়েকদিন আগে আমরা আমাদের স্বাধীনতার ৫৫তম বার্ষিকী উদযাপন করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক অর্জন থাকলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আমরা এখনও পিছিয়ে। গত ৫৫ বছরে ক্ষমতায় আসা যে কোনো রাজনৈতিক দলই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুরো মনোযোগ দেয়নি। গণতন্ত্রকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি।
সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে, গণতন্ত্র মানে শুধুই ভোটের স্বাধীনতা। ভোট দিয়ে সরকার আসে বা যায়—এটাই গণতন্ত্র। অথচ গণতন্ত্র সমাজের সব ক্ষেত্রেই চর্চা করা প্রয়োজন এবং এটি আইনের শাসনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু এ বিষয়টি কখনোই জনগণকে বোঝানো হয়নি। এর পেছনে উদ্দেশ্য স্পষ্ট—যদি গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা কঠিন হয়ে যায়। তাই ভোটতন্ত্রের আড়ালে গণতন্ত্রকে ঢেকে রাখার চেষ্টা সব দলই করেছে।
গণতন্ত্রের যথাযথ বিকাশ না হওয়ায় আইনের শাসনও বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে। তার ফলস্বরূপ, গ্রামীণ সালিশের মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা গ্রামজীবনে শিকড় গেড়ে বসছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, অতীতে সালিশ স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মূলত জমিজমা বা দেওয়ানি ধরনের বিরোধ মেটাতেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন ফৌজদারি অপরাধ নিয়েও সালিশ হচ্ছে, এবং অনেক সময় এর নামে যথেচ্ছাচার ঘটছে।
কয়েক দশক আগেও বড় কোনো ঝগড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে আশপাশের পাঁচ-সাত গ্রামের প্রভাবশালী মুরব্বিদের সমন্বয়ে সালিশ হতো। তারা বিবাদমান পক্ষের সাক্ষ্য প্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্ত দিতেন। সেই সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ যেত না। কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থা নেই। বর্তমান সময়ে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাই সালিশের হর্তাকর্তা। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, সালিশের নামে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজেও হস্তক্ষেপ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে সালিশের সিদ্ধান্ত বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে শতাব্দীপ্রাচীন সালিশের গৌরব হারাচ্ছে।
সুষ্ঠু গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ না হয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে পড়ছেন। ক্ষেত্রবিশেষে তারা অপ্রাতিষ্ঠানিক সালিশকেও উৎসাহিত করছেন। এর ফলে গ্রামে দুর্বলের ওপর প্রভাবশালীদের অত্যাচার বেড়ে চলেছে, মানুষের আস্থা কমছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি। আগে এ ধরনের ঘটনায় রাজধানীতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হতো। মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা এগিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন কোনো মহলেই এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
ফলাফলে, যে ভয়াবহতা ঘটছে তার চূড়ান্ত উদাহরণ দেখাল জামালপুরের জোসনা বানুর আত্মহত্যা। তিনি মারা গিয়ে অপমান ঢেকে দিয়েছেন, কিন্তু এই ঘটনায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চেহারা নগ্ন হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—কেউ কি এটি ঢাকতে পারবে?
সূত্র: মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক।

