বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদ ভেঙে গেলে অথবা সংসদ অধিবেশন না থাকলে কোনজরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।কিন্তু কোনো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর আহূত সংসদের প্রথম অধিবেশনে এটি উপস্থাপিত হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ পাস করলে আইনে পরিণত হবে, অন্যথায় অধ্যাদেশের কার্যকারিতা হারাবে।
এ বিবেচনা থেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত ১৩৩টি অধ্যাদেশ ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এখানে সাদা চোখে যেই গলদ বা দুর্বলতা চোখে পড়ে, তা হলো ১৪ সদস্যের কমিটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্য কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব নেই। এর মধ্যে বিএনপি থেকে ১১ জন ও জামায়াত থেকে ৩ জন সদস্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই দুই দলের বাইরে এনসিপি, গণ অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ছিল। ছিলেন সাতজন স্বতন্ত্র সদস্যও। তাঁদের মধ্য থেকে সদস্য নিলে কমিটি যেমন সমৃদ্ধ হতো, তেমনি বহুদলীয় চরিত্র পেত।
কমিটি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অবিকল গ্রহণ করেছে। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬ জারি করা হয়েছিল, কমিটি কী যুক্তিতে সেগুলো রহিত করল? সেটা কি এ কারণে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে এত দিন যে সরকারের একক ক্ষমতা ছিল, সেটাই বিএনপি সরকার বহাল রাখতে চায়? এত দিন নিম্ন আদালতের নিয়োগ ও পদায়নে যে নির্বাহী বিভাগের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ চলে আসছিল, তারাও সেটা অনুসরণ করতে আগ্রহী?
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধনের পক্ষ যুক্তি দেখাচ্ছে যে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হবে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুম হিসেবে না দেখানোরও যে যুক্তি বিএনপির জনপ্রতিনিধিরা দেখাচ্ছেন, তাঁরাই একসময় তার শিকার হয়েছেন। আমাদের দেশে ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞাও বদলে যায়।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই সংসদে বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর অর্থ অধ্যাদেশগুলো বাস্তবায়নে এর আগে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো বৈধতাপূর্বক বাতিল হয়ে যাবে। সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তাতেও অতীতে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে এভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।
সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা থাকলেও এত দিন এটা হয়নি। নির্বাহী বিভাগ আরও নির্দিষ্ট করে বললে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হতো। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করে। এতে বলা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। এই অধ্যাদেশে কোনো দুর্বলতা বা ঘাটতি থাকলে সরকার সেটি সংশোধনের কথা বলতে পারত। সেসব না করে পুরোপুরি আইনটি বাতিল করার অর্থ সরকার বিচার বিভাগকে আগের সরকারগুলোর মতোই অধীন করতে চায়। তারা মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নেও অনাগ্রহী।
অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান-সংক্রান্ত বিষয়াদি পালন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ করা হয়। এই অধ্যাদেশ বাতিল করারই–বা কী যুক্তি থাকতে পারে। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে বিচারকাজ পরিচালনা করবে, সেটা কি সরকারের নীতিনির্ধারকদের পছন্দ নয়?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, এ দুটি অধ্যাদেশ সংশোধন এবং যাচাই-বাছাই করে নতুন করে আইন করা বাঞ্ছনীয়। তবে এটা রহিত করা কোনোভাবে ঠিক হবে না।
এ ছাড়া প্রশাসনের জবাবদিহি বাড়াতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ ও তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু কমিটি সেগুলো অনুমোদন না দিয়ে ‘স্থগিত’ করেছে।
দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধানক্ষমতা বাড়িয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৫ সালে। এতে সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান, বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকেও আইনের আওতায় আনা এবং কমিশনের সদস্য বাড়ানো হয়।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধনের পক্ষ যুক্তি দেখাচ্ছে যে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হবে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুম হিসেবে না দেখানোরও যে যুক্তি বিএনপির জনপ্রতিনিধিরা দেখাচ্ছেন, তাঁরাই একসময় তার শিকার হয়েছেন। আমাদের দেশে ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞাও বদলে যায়।
সরকার যে ৯৮টি অধ্যাদেশ অবিকল গ্রহণ করেছে, এ জন্য তারা ধন্যবাদ পেতে পারে। কিন্তু তারা যেগুলো বাদ দিয়েছে এবং যাচাই–বাছাই করার জন্য স্থগিত করেছে, দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে তার পক্ষে জোরালো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংশোধন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট সত্তার কার্যক্রমকে নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয় এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সত্তার মিছিল-মিটিং, প্রকাশনাসহ যেসব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা যাবে, তার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি।
প্রশ্ন হলো সেই সংশোধন অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পক্ষে থাকবে না বিপক্ষে? ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার হবে। এমনকি দল অপরাধ করলেও তার বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক একমাত্র আদালত, কোনো নির্বাহী আদেশ নয়।
এ মুহূর্তে দুটি বিষয় নিয়েই সংসদ উত্তপ্ত। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ। এ অধ্যাদেশের সব কটিই যে জনকল্যাণের কথা ভেবে করা হয়েছে, তা নয়। কিন্তু যেসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সরকারকে অধিকতর জবাবদিহির আওতায় আনতে, সেগুলো রহিত বা স্থগিত করার কোনো যুক্তি নেই। সংসদে বিএনপির দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যেকোনো আইন পাস করতে পারে। কিন্তু সেই আইন গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী না করে যদি আরও দুর্বল করে, তাহলে নিকট অতীতে গণ-অভ্যুত্থানে এতগুলো মানুষ কেন জীবন দিল?
লেখক: সোহরাব হাসানের কলাম

