বর্তমানে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম জ্বালানি নিরাপত্তা। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এই খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাজেটে জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক।
সাবেক অর্থসচিব ও মহা হিসাব-নিরীক্ষক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী এসব কথা বলেন। তিনি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুসলিম চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিকম (সম্মান) এবং এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিংয়ে ডিস্টিংশনসহ এমএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৮৪ সালের ব্যাচে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে যোগদানের পর তিনি কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টস, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স ও অর্থ বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় মুসলিম চৌধুরী বলেন, আগামী বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিল্পে সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশ্ন: আগামী অর্থবছরের বাজেটে কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেই হবে। বাজেটে এ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন: সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: এখন একশোর বেশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে, যেগুলো ২০-২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। লক্ষ্যভ্রষ্টতার ঝুঁকি থাকে। আমি মনে করি, এগুলোকে ‘লাইফ সাইকেল’ ভিত্তিতে পুনর্গঠন করে চার-পাঁচটি বড় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা উচিত। একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে পরিচালনা করলে স্বচ্ছতা বাড়বে, অপচয় কমবে এবং আরও বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
প্রশ্ন: অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আপনার মত কী?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: আমরা ইতোমধ্যে অনেক ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার করেছি- রাস্তা, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল। এখন সময় এসেছে মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়ার। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তিনির্ভর স্কিল ডেভেলপমেন্টে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। মেগা প্রকল্প কিছুটা কমিয়ে ‘সফট স্কিল’ ও প্রযুক্তিখাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: এতে কোন ধরনের সুফল পাওয়া যাবে?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: এতে একদিকে দেশ প্রযুক্তিগতভাবে এগোবে, অন্যদিকে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো প্রচলিত শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে, তাই আমাদের জনশক্তিকে আপস্কিল করে নতুন খাতে নিয়ে যেতে হবে।
প্রশ্ন: মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: মূল্যস্ফীতি এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বাহ্যিক কারণেও বাড়ছে। এ অবস্থায় নীতিগত সুদের হার হঠাৎ কমিয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তাই আমার মতে, কিছুদিন বর্তমান নীতিই অব্যাহত রাখা উচিত, যদিও এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কিছুটা কমতে পারে।
প্রশ্ন: বিনিয়োগ বাড়াতে কোন ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ঋণ দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। কারণ মোট কর্মসংস্থানের ৭০-৮০ শতাংশ এই খাত থেকে আসে। এক্ষেত্রে জামানতনির্ভর ঋণ ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করতে হবে, যাতে নারী উদ্যোক্তারাও সহজে ঋণ পান।
দ্বিতীয়ত, বড় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ব্যাংকঋণের বদলে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে আসা উচিত। শেয়ার ও বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বড় বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহ করলে ব্যাংকিং খাতে চাপ কমবে এবং পুঁজিবাজারও গতিশীল হবে। এজন্য স্বচ্ছ নীতি কাঠামো ও পেশাদার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রশ্ন: যতটুকু জানা যাচ্ছে এবার সরকার বড় বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় বাজেটের পরিকল্পনা নিয়ে আপনার মত কী?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: বর্তমানে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম, প্রায় ৭-৮ শতাংশ। এ অবস্থায় রাজস্ব না বাড়িয়ে বড় বাজেট করলে সেটি হয় ব্যাংক ঋণনির্ভর হবে, নয়তো টাকা ছাপিয়ে অর্থায়ন করতে হবে। দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে ও মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
প্রশ্ন: তাহলে বাজেটের আকার কেমন হওয়া উচিত?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: বাজেটের আকার বাড়াতে হলে কর-জিডিপির অনুপাত অন্তত ১-১.৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। তবে তা হতে হবে প্রগতিশীল করব্যবস্থার মাধ্যমে, যাতে নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আমি সম্প্রসারণমূলক বা সংকোচনমূলক বাজেটের কথা বলবো না। বরং বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ, দক্ষ ও টেকসই বাজেট প্রণয়নই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন।
আমি বলতে চাই কর-জিডিপি অনুপাত না বাড়িয়ে বাজেটের আকার বাড়ানো ঠিক হবে না। কর-জিডিপি অনুপাত কমপক্ষে ২ শতাংশ না পারলেও এক থেকে দেড় শতাংশের মতো বাড়াতে হবে এবং ওইটা দিয়ে বাজেটের আকার যতটুকু বাড়ানো যায় ততটুকুই হওয়া উচিত।
বাজেটের আকার বড় করতে হলে রাজস্ব আয় বাড়াতেই হবে। রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ঋণ করে বাজেটের আকার বড় করলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেসরকারি খাতের বৃদ্ধি হবে না। আর যদি বলেন ঋণ করবো না, তাহলে টাকা ছাপাতে হবে। টাকা ছাপালে তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। তখন মূল্যস্ফীতি ১২-১৪ শতাংশ হয়ে যেতে পারে, এমনকি ২০ শতাংশও হয়ে যেতে পারে। কাজেই বাজেটের আকারটি খুবই সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে। সূত্র: জাগো নিউজ

