বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আগের সরকারের নেওয়া ব্যাংক খাতের সংস্কার উদ্যোগ চলমান থাকবে–এমন আশ্বাস দিলেও সরকার পরিবর্তনের পর গভর্নর পরিবর্তন হয়েছে। ফলে সংস্কারকাজে আগের যে ধারা ছিল, সেই ধারার মধ্যে কিছুটা হলেও ছেদ পড়বে। নতুন সরকার এসেছে তারা যেটা তাদের দৃষ্টি থেকে যেগুলো তারা সঠিক মনে করবে সেই উদ্যোগগুলোই তারা এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে ব্যাংক খাতে বর্তমানে যে আস্থাহীনতা এবং স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, সেটি যেন কাটিয়ে ওঠার জন্য যেসব সংস্কার উদ্যোগ এই মুহূর্তে জরুরি সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবেই সরকারকে করতে হবে।
ব্যাংক খাতের সমস্যার গভীরতা চিহ্নিত করতে আগের সরকারের সময়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। যেমন, খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিতকরণ, এর আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেগুলোকে কমিয়ে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, সেটা অনেকটাই দূর হয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটা ব্যাংক একীভূতকরণের জন্য ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছে। এখন সেটাকে আইনে পরিণত করতে হবে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য একটি টাইম বাউন্ড অ্যাকশন প্ল্যান বা সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। এর জন্য দেশের উন্নয়নের জন্য ব্যাংক খাতকে তার সঠিক ভূমিকা পালন করতে দিতে হলে সংস্কার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা জরুরি। বর্তমানে মানুষের মনে ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো স্থায়ী হওয়া নিয়ে এক ধরনের আশঙ্কা কাজ করছে। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলে মানুষের মনের এই ভয় ও অনিশ্চয়তা দূর করা সম্ভব হবে। সংস্কার নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একটি টাইম বাউন্ড প্ল্যান থাকলে সাধারণ মানুষ সংস্কার কার্যক্রম পূরণ হওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা সহজ হবে। সংস্কারের গতি ধরে রাখতে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজগুলো শেষ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
একবার দেশের টাকা দেশের বাইরে চলে গেলে তা ফেরত আনা অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। এটি তাৎক্ষণিকভাবে বা খুব দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। যে দেশগুলোতে টাকা পাচার করা হয়েছে, সেখানে সেই দেশের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকে। সেই আইনি ধাপগুলো পার হয়ে টাকা ফেরত আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা কেবল প্রথম ধাপ, যা সরকার ইতোমধ্যে শুরু করেছে। এরপর আরও অনেক ধাপ বা স্তর পার করতে হয় যা প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘায়িত করে।
- মুস্তফা কে মুজেরী: সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক।

