ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া অধ্যাদেশ এবং বর্তমানে সরকারের পদক্ষেপগুলো দেশের সংবিধান ও আইনশৃঙ্খলার প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তিনি সাউথ এশিয়ান ফর হিউম্যান রাইটসের নির্বাচিত ব্যুরো মেম্বার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে বর্তমান সংবিধান সংস্কার ও সরকারের পদক্ষেপগুলোর প্রেক্ষাপটে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দিয়েছে।
তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া এবং অধ্যাদেশের ব্যবহার নৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলো এই প্রসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ড. আসিফ নজরুল মনে করেন, সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব, তবে এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
সম্প্রতি তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশ নিয়ে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, সংস্কার ইত্যাদি প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন।
আসিফ নজরুল: বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই কিছু হতাশা বা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে; কিন্তু এটাকে একপক্ষীয়ভাবে দেখতে চাই না। এর ইতিবাচক দিকও আছে, সেটি আগে বলি। সংসদের বিশেষ কমিটি যেসব আইন হুবহু গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি, আইনগত সহায়তা, সাইবার সুরক্ষা বা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা–সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাস্তবিক অর্থে নাগরিকদের সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ বাড়াবে।
এ ছাড়া জুলাই-সংক্রান্ত কয়েকটি আইন, যেমন জুলাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, শহীদ ও যোদ্ধা পরিবারের কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন এবং দায়মুক্তির বিধান—এসব রাখা হয়েছে। এগুলো শুধু আইন নয়, একটি ঐতিহাসিক অর্জন ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি। পরিবেশ–সংক্রান্ত আইনগুলোও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা প্রশংসনীয়।
তবে সমস্যা হলো, এই ইতিবাচক আইনগুলোই যথেষ্ট নয়। যে ত্যাগ, যে প্রাণহানি, যে গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আরও গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার প্রত্যাশিত ছিল। সেগুলো আপাতত করা হচ্ছে না। সরকার বলছে, কিছু আইন সংশোধন করে আবার আনা হবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এগুলো শুধু আশ্বাস পর্যায়ে থেকে যায়। তাই পুরোপুরি স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই।
আসিফ নজরুল: বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল নিয়ে কিছু বিতর্ক ছিল, সেটি অস্বীকার করছি না। সংবিধানে যেখানে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শের কথা বলা হয়েছে, সেখানে কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু এর যৌক্তিকতা আইনটির প্রস্তাবনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তারপরও এগুলো সংশোধনযোগ্য বিষয়, এ জন্য পুরো আইন বাতিল করা ঠিক হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল হওয়াটা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে হতাশ করেছে। এটি দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, এমনকি ২০২৪ সালের আদালতের রায়েও এটার নির্দেশনা রয়েছে। ইতিমধ্যে এই আইনের অধীনে কিছু কাঠামোগত অগ্রগতি হয়েছে। জনবল নিয়োগ, বাজেট প্রস্তুতি, আলাদা কার্যালয় তৈরি—এসব প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল।
কারও কারও আপত্তি ছিল অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবে সুপ্রিম কোর্টে হস্তান্তর নিয়ে। কিন্তু আমরা তো তাৎক্ষণিকভাবে তা দিইনি। বলেছিলাম, সচিবালয় পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে ধাপে ধাপে হবে। ফলে এ রকম কোনো অজুহাতে পুরো আইন বাতিল করা হলে তা হতাশাজনক। তবে আমি এখনো আশা ছাড়তে চাই না। এখনই গ্রহণ না করা হলেও, এই আইনগুলো অদূর ভবিষ্যতে প্রণয়ন করার সুযোগ থাকবে। সরকারের উচিত, বিরোধী দলের চাপে বা জনগণের সমালোচনার মুখে নয়, নিজের উপলব্ধি থেকেই এমন উদ্যোগ নেওয়া।
আসিফ নজরুল: এ দুটি আইন প্রণয়নের জন্য আমরা অনেক কষ্ট করেছিলাম। অন্য সব বিষয়ে সমালোচনামুখর দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন ও অ্যাকটিভিস্টরা ও মানবাধিকারকর্মীরাও আইন দুটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন। এ ছাড়া নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অপশনাল প্রটোকল অনুযায়ী একটি জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থা গঠনের বিষয়টি মানবাধিকার আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা যায়। গুম আইনটিও এ–সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষরাষ্ট্র হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছিল। ফলে এসব আইন শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা নয়, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এগুলো উপেক্ষা করা হলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা থেকে যাবে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব আইন পুরোপুরি বাতিল করা বর্তমান সরকারের পক্ষে হয়তো সহজ হবে না। বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী অতীতে গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গুম প্রতিরোধ আইন না হলে মায়ের ডাকের সানজিদা কিংবা গুমের শিকার ইলিয়াস আলীর পরিবারগুলোকে কী উত্তর দেবে বিএনপি। এসব স্মরণ রেখে বিএনপি বরং অচিরেই আমাদের আমলের চেয়ে শক্তিশালীভাবে এসব আইন প্রণয়ন করবে বলে আশা করি।
আসিফ নজরুল: আমরা যদি গুম প্রতিরোধ আইন না করি বা মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল রাখি, তবে তা অবশ্যই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার পরিপন্থী হবে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান শুধু বৈষম্যের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের গুম, খুন, নির্যাতন ও হয়রানির মতো অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ থেকেই তা বিস্ফোরিত হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার–সংক্রান্ত আইনগুলো সেই আন্দোলনের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আসিফ নজরুল: কোনো আইনই নিখুঁত নয়, সব সময়ই উন্নয়নের জায়গা থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ প্রণয়নের সময় টিআইবি যে সুপারিশগুলো দিয়েছিল, তার অনেকগুলোই গ্রহণ করা হয়েছে। ধরা যাক, ১০টির মধ্যে ৭টি রাখা হয়েছে। তবে সব সুপারিশ গ্রহণ সম্ভব হয়নি। কারণ, আমলাতান্ত্রিক চাপ, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতামত এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে আশঙ্কার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়েছে।
সমস্যা হচ্ছে, সমালোচনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিকগুলো অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। গঠনমূলক সমালোচনা হলে; অর্থাৎ কোন অংশ ভালো এবং কোন অংশ উন্নত করা দরকার দুটি দিকই তুলে ধরা হলে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে। ভবিষ্যতে যদি আইনটি পুনর্বিবেচনা করা হয়, তখন এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এখানে একটি বড় বিষয় হলো বাস্তবতা। শুধু সুন্দর আইন করলেই হবে না; রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা বিবেচনায় নিতে হয়। অনেক দেশেই ভালো আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের সক্ষমতা না থাকলে তা কার্যকর হয় না। তাই আইন হতে হবে শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে বাস্তবসম্মত।
আসিফ নজরুল: এখানে মূল বিষয় হচ্ছে নিয়ত। যদি আইন সংশোধনের লক্ষ্য হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি বাড়ানো এবং মানুষের ভোগান্তি হ্রাস, তাহলে তা ইতিবাচক। কিন্তু যদি সংশোধনের মাধ্যমে আইনকে দুর্বল করা হয়, জবাবদিহি কমানো হয় বা সরকারের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
আসিফ নজরুল: কিছু অধ্যাদেশ সরাসরি সরকার বা রাষ্ট্রের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও জনকল্যাণমূলক। যেমন আইনগত সহায়তা বৃদ্ধির উদ্যোগের ফলে বহু মামলা আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য বড় স্বস্তি। ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধন মানুষের হয়রানি কমাতে সহায়ক হবে, যদিও এসব পরিবর্তনের ফল এক দিনে দৃশ্যমান হয় না।
এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশটি ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, যেখানে সমালোচক ও ভুক্তভোগীদের মতামতও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষার আইনও গুরুত্বপূর্ণ। এসব আইন সরকার গ্রহণ করছে, তা প্রশংসনীয়। তবে সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বা মানবাধিকার কমিশন বা গুম প্রতিরোধ–সংক্রান্ত আইনগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসব আইন না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া কঠিন হবে।
আসিফ নজরুল: গণভোট অধ্যাদেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ‘দায়মুক্তি’–সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে, যা আইন বাতিল হলে আর থাকবে না। এ ছাড়া এতে কিছু অপরাধ ও দণ্ড–সম্পর্কিত বিধানও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গণভোট অধ্যাদেশটি সংরক্ষণ ও গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আসিফ নজরুল: আমার মতে, বিতর্কটি মূলত প্রক্রিয়াকে ঘিরে। বিএনপি বলছে, সংসদের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন সম্ভব এবং অতীতেও তা হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো মনে করে, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের সার্বভৌমত্ব ও গণ–অভ্যুত্থানের ভিত্তিতে একটি ‘কনস্টিটিউয়েন্ট অথরিটি’র মাধ্যমে মৌলিক সংস্কার হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা কম থাকে। তবে আমার দৃষ্টিতে প্রক্রিয়ার চেয়ে লক্ষ্য অর্জন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও বিরোধী দল যদি ঐকমত্যে পৌঁছায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা সংসদ যেকোনো ফোরামের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। মূল বিষয় হলো, কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা।
আসিফ নজরুল: জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর পুরোপুরি সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করা বাস্তবে সম্ভব ছিল না। তবে চেষ্টা ছিল যতটা সম্ভব সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকা। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির জুলাই-সংক্রান্ত আদেশকে মূল্যায়ন করতে হবে। আদেশের প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এটি গণ–অভ্যুত্থানে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গৃহীত।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে রাষ্ট্রপতির আদেশকে অসাংবিধানিক বলা কঠিন। এ ছাড়া বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে ‘পোস্টভ্যালিডিটি’ বা পরবর্তী বৈধতা দেওয়ার নজির রয়েছে—যেমন পঞ্চম, সপ্তম বা একাদশ সংশোধনী। প্রয়োজনে এমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ ধরনের পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া সম্ভব। সুতরাং বিষয়টি কেবল আইনগত ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশাও। গণভোটে যে রায়, সেটিও আমাদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
আসিফ নজরুল: সংস্কারকে দুভাবে দেখতে হবে। প্রথমত, ভালো আইন প্রণয়ন—যেখানে সমাজের চাহিদা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, দেশের আইনগত ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়। এই অংশ তুলনামূলক সহজ। কিন্তু কঠিন অংশ হলো সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং জনগণকে প্রস্তুত করা। ইতিহাস বলছে, কোনো সংস্কারের ফল তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায় না। যেমন সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউয়ের সংস্কারের সুফল পেতে ৫–১০ বছর সময় লেগেছে। সেখানে আমরা পেয়েছি মাত্র দেড় বছর। সেই সীমিত সময়েও কিছু ইতিবাচক ফল দেখা যাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আইনগত সহায়তা–সংক্রান্ত সংস্কারের ফলে এখনই তিন থেকে চার গুণ বেশি মামলা আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হচ্ছে। দেওয়ানি কার্যবিধির সংশোধনে মামলা নিষ্পত্তির সময় কমেছে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন সহজ হওয়ায় প্রবাসীসহ বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। রেজিস্ট্রেশন আইন ও নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টে পরিবর্তনের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি গুম প্রতিরোধ আইনের ফলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে উত্তরাধিকার দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আমরা ভিত্তি তৈরি করেছি—এখন তা দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের।
আসিফ নজরুল: সংস্কার আলোচনার সময় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সংস্কারবিরোধী মনোভাব দেখিনি। তবে সংস্কারের ফলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের মধ্যে সতর্কতা ছিল, সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু ভিন্নমত ছিল।
বিএনপি নিজেই স্বৈরাচারী শাসনামলের বড় ভুক্তভোগী। তাই তাদের পক্ষে সংস্কারের বিরুদ্ধে থাকা স্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কতটুকু সংস্কার চায় এবং সেটি জনগণের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারছে। বিএনপি বলছে, কিছু সংস্কার এখন নয়, পরে করা হবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার কারণে জনগণের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। এটাই সমস্যার একটা কারণ।
তবে বিএনপির সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের মধ্যে সংস্কারের এমন অনুকূল পরিবেশ খুব কমই এসেছে। সংস্কার নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি, প্রস্তুতিমূলক বহু কাজও করা হয়েছে—সব মিলিয়ে এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
আসিফ নজরুল: আমি মনে করি, এটি অতিরঞ্জিত আশঙ্কা; বাস্তবে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে সাইবার সুরক্ষা আইনকে ধরা যায়। আগে এ ধরনের আইনের অপব্যবহার করে বিরোধী মত দমন করা হতো, কিন্তু এখন সেই সুযোগ অনেক কমে গেছে। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও আগের মতো হয়রানির সুযোগ নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এখন দেশে কার্যকর বিরোধী দল রয়েছে, যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। সংসদের ভেতরে যেমন নতুন নেতৃত্ব আছে, তেমনি বাইরে তরুণ প্রজন্মও সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।
এই বাস্তবতায় অতীতে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা জোরালো নয়। তবে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সামনে কত দূর অগ্রসর হওয়া যাবে, সেটি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ থাকতে পারে। এটি যৌক্তিক। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ভবিষ্যতে আর কখনো জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ না থাকে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপির দায়িত্ব অনেক বেশি। তাদের এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে জনগণের মনে অতীতের মতো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকে। সূত্র: প্রথম আলো

