দেশ এক জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দেড় বছর দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে বৈশ্বিক পরিস্থিতি পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
সরকার পরিবর্তনের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়, যার প্রভাব দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আর গ্রীষ্ম আসার আগেই শুরু হয়েছে লোডশেডিং।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। তবে জ্বালানির ঘাটতির কারণে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হচ্ছে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যেই সাম্প্রতিক এক দিনে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট, যেখানে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে ব্যয় সংকোচনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। অফিস সময়সূচি পরিবর্তনসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়—নাগরিকদের সচেতন আচরণও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো গেলে সামগ্রিক চাপ কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই সময় কিছু অসাধু কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ মজুত ও পাচারের মতো কর্মকাণ্ড সংকট বাড়াচ্ছে, যা আইনগত অপরাধের পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
অর্থনীতির আরেকটি বড় চাপ তৈরি হয়েছে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে এই ঋণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, এবং এর বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, কর্মসংস্থানে সংকোচন এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতেও অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং নীতিগত অস্থিরতা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি বহুমাত্রিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়—সমাজের সব স্তরের মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টাই হতে পারে উত্তরণের পথ। সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন ধৈর্য, সংযম ও দায়িত্বশীলতা। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

