ড. ইফতেখারুজ্জামান বর্তমানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দীর্ঘ গবেষণা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায়। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন এবং কলম্বোর ‘রিজিওনাল সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (বিআইআইএসএস)-এ সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং রিসার্চ ডিরেক্টরের ভূমিকাও পালন করেছেন। ২০০৮ সালে তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি তিনি মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমনের অধ্যাদেশগুলোর বর্তমান প্রেক্ষাপটে মন্তব্য করেছেন।
প্রশ্ন: মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমনের অধ্যাদেশগুলো সরকার স্থগিত বা পুনর্বিবেচনা করায় টিআইবি মনে করছে, সরকার পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিষয়টি খুলে বলবেন?
ইফতেখারুজ্জামান: জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের জনপ্রত্যাশা বিকশিত হলেও এই দাবি বহুদিনের। অনেক আগে থেকেই মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মৌলিক সংস্কারের আলোচনা চলছিল। সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে– সেই লক্ষ্যে সুপারিশগুলো রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ গঠিত বিভিন্ন কমিশনের কাছ থেকে এসেছিল। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরও এমন প্রত্যাশা ছিল। এই প্রত্যাশা বড় রাজনৈতিক দলগুলো সেভাবে মেনে নিতে পারেনি, যদিও তারা নিজেরাই বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণের কারণে ভুক্তভোগী। বড় দলগুলো এমনও বলেছে, সরকারের হাত-পা বেঁধে দেবে না। জবাবদিহিকে রাজনৈতিক দলগুলো হাত-পা বেঁধে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করে।
প্রশ্ন: আপনি এটিকে রাষ্ট্রের পশ্চাৎমুখী হওয়া বলছেন কেন?
ইফতেখারুজ্জামান: অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে গুটিকয়েক ক্ষেত্রে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছিল, তার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ উল্লেখযোগ্য। এসব বিষয় রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দুটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশে টিআইবি হতাশ। এটিই দেশের পেছনে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে বিস্মিত হইনি। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংস্কার, পরিবর্তন বা বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কিছু শেখার প্রবণতা নেই। যে অধ্যাদেশগুলো তারা বাদ দিয়েছে বা স্থগিত করেছে সেসব রাষ্ট্র সংস্কার বলতে যা বোঝায় তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে শীর্ষে বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা আজকের নয়।
প্রশ্ন: এখন কি প্রধানমন্ত্রীর পছন্দে বিচারক নিয়োগ হবে?
ইফতেখারুজ্জামান: বাস্তবে সরকারের পছন্দ অনুযায়ীই হওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে, যেখানে দলীয় আনুগত্য হবে অন্যতম মানদণ্ড। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে। সরকার এখন চাপের মুখে হয়তো বলছে, তারা দেখবে। কিন্তু তারা সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানায়নি। তারা যে বলেছে, কয়েক দফা পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এতে আমি আস্থাশীল হওয়ার মতো কিছু দেখি না। পর্যালোচনার নামে এই আইনগুলোকে আরও দুর্বল করার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের মধ্যে বিধান আছে নিরাপত্তা বাহিনীর যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। সেখানে স্বার্থান্বেষী মহল চাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে তদন্ত করতে সরকারের পূর্বানুমতির শর্ত। আটকের ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদনের পরিবর্তে সরকারের অনুমতির বিধান চাইছে। বাছাই কমিটিতে অবসরপ্রাপ্ত আমলা অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, যেন কমিশনকে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের আরও একটি পুনর্বাসনস্থলে পরিণত করা যায়। তদুপরি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তারা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনতে চাইছে।
কোনো সংস্থাকে মন্ত্রণালয়ের অধীন করলে সেটি স্বাধীন থাকে না। তা ছাড়া এটি প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এতদিন ধরে ‘সি’ গ্রেডে রয়েছে। যদি সরকার, আমলাতন্ত্র ও নিরাপত্তা সংস্থার নিয়ন্ত্রিত কমিশন হয়, তাহলে এমন নামমাত্র প্রতিষ্ঠান থাকার যথার্থতা কোথায়? ‘সি’ গ্রেডের মানবাধিকার কমিশনের অভিজ্ঞতা দেশের মানুষের যথেষ্ট হয়েছে। একই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির জন্য হাজারো মানুষ প্রাণ দেয়নি।
প্রশ্ন: আপনাদের প্রস্তাব অনুযায়ী আইন বাস্তবায়ন হলে কি ‘এ’ গ্রেডে উত্তীর্ণ হতে পারে?
ইফতেখারুজ্জামান: অবশ্যই। একটি বিষয়ে দুর্বলতা ছিল। সেটি নিয়ে আমরা অনেকবার বলেও কিছু করতে পারিনি। মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাস হলে আমরা সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। কিন্তু ডিসেম্বর মাসেই দেখলাম আরেকটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, বাছাই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সদস্য হবেন। এটি নতুন যোগ হলো। আমলাতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের অধীনে রাখতে চায়, এটি তার উদাহরণ। রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে দখলে রাখতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারও একই পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই অবস্থা বিচার বিভাগ নিয়েও।
প্রশ্ন: গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারের এই পদক্ষেপের পর করণীয় কী?
ইফতেখারুজ্জামান: কোনো আইনই পাথরে খোদাই করা হয় না। চেষ্টা করব সংস্কারের জন্য অধিপরামর্শ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে। আইনের দুর্বলতা সত্ত্বেও তার প্রয়োগে জনস্বার্থের কতটুকু প্রতিফলন ঘটছে তা নজরে রাখতে। আর যেগুলো বাদ গেল সেগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ট্র্যাক করব। আমরা যেমন সরকারের সমালোচনা করি, আবার সরকারকে সহায়তাও করতে চাই। জনগণের কাছে তাদের যে অঙ্গীকারগুলো থাকে সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করি। অন্যদিকে তারা যখন ভুল করবে সেটিকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাদেরই সহায়তা করতে চাই। সমালোচক মাত্রই শত্রু– এমন ভাবনা অগণতান্ত্রিক। ৬ এপ্রিল যা প্রকাশ করলাম, এখানেই শেষ নয়। এটি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনার সুযোগ হবে বলে আশা করি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতাহীনতা, মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের অকার্যকারিতার ভুক্তভোগী দেশবাসী। বিএনপিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এর ভুক্তভোগী হয়েছেন। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা খালেদা জিয়া নিজেও এর শিকার হয়েছিলেন; প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ভুক্তভোগী। আমাদের প্রত্যাশা, তারা সেসব অভিজ্ঞতা না ভুলে স্ববিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসবেন।
প্রশ্ন: তাহলে বিএনপি কেন রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে চাচ্ছে না?
ইফতেখারুজ্জামান: সম্ভবত বিএনপি ও আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশ মনে করছে, এখন ‘আমাদের পালা’। এই যে সংস্কৃতি, সম্ভবত এটির কারণেই তারা সরে আসতে পারছে না। বাস্তবে নিজেরা ভুক্তভোগী হলেও সেই কর্তৃত্বের সংস্কৃতি তাদের আটকে দিচ্ছে।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি কমিশনগুলোর সব সংস্কার প্রস্তাব কি জনগণের অধিকার নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছে?
ইফতেখারুজ্জামান: শতভাগ কোনো দেশেই হয় না, আমাদের ক্ষেত্রেও হয়নি। অনেক সুপারিশ ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ ছিল, যা করতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই বলেছি, সবাই সংস্কার চায়, দেশবাসী সংস্কার চায়। অন্তর্বর্তী সরকারও চায়। কিন্তু তাদের নিজেদের ভেতরেই অনেক প্রতিকূল মহল ছিল, যেমন এখনও আছে। আপনি একভাবে সংস্কার চান, আরেকজন আরেকভাবে চায়। আন্দোলনে সবাই একটা পতাকা ধরেছে একটা কমন শত্রুর বিরুদ্ধে। কিন্তু সবার গন্তব্য বা উদ্দেশ্য এক ছিল না, এখনও না। এই পরিপ্রেক্ষিতেই অধ্যাদেশগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হলে আমরা দেখলাম সরকারের ভেতর থেকে প্রতিরোধ আসতে শুরু করল। আবারও বলি, এ প্রতিরোধের অন্যতম উৎস আমলাতন্ত্র।
প্রশ্ন: আমলাতন্ত্রের সংস্কৃতি কেমন?
ইফতেখারুজ্জামান: আমলাতন্ত্রের দুটো চরিত্র। একটা দলীয় রাজনৈতিক চরিত্র; যেটি বাংলাদেশে শুধু গত ১৬-১৭ বছর নয়, দীর্ঘকালের চর্চা। এক ধারার দলীয় প্রভাবান্বিত আমলাতান্ত্রিক শক্তির অপসারণ করে আরেকটা দলীয় আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলছে। দ্বিতীয় চরিত্র, আমলাতন্ত্র নিজেদের স্বার্থের বাইরে কখনোই সরকারকে সহজে কিছু করতে দেবে না। মানে তারা যতটুকু চায় ততটুকুই হবে, এর বাইরে কিছু হবে না।
এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। হয়তো অন্তর্বর্তী সরকার আমলাদের সঙ্গেই আলোচনা করে রাজি হয়েছে কোনো বিষয়ে। পরে দেখা গেছে তারা এখানে বিরোধী মত দিয়েছে। মানবাধিকার কমিশন, দুদকের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। তারা মিটিংয়ে একমত হয়েছেন। সবাই খুশি হয়ে চলে এসেছেন। অধ্যাদেশ পাসের পর দেখলাম, ব্যাপার ভিন্ন। জানা গেল, আমলারা বাধা দিয়েছেন। আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি এতটাই প্রভাবশালী।
প্রশ্ন: কিন্তু আপনাদের কমিশনগুলোতে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছিল না। শুধু থিঙ্কট্যাঙ্ক দিয়ে কি জনগণের চাওয়া-পাওয়া বোঝা যায়?
ইফতেখারুজ্জামান: ঠিক আছে; রাজনৈতিক দল সরাসরি ছিল না। কিন্তু লিখিতভাবে তাদের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে, অনেকে দিয়েছেন। আমি বলছি না, কমিশনগুলো পুরোপুরি জনগণকে সম্পৃক্ত করেছে। সেই সক্ষমতা, সময় কোনোটাই ছিল না। তবে আমি যে কমিশনে ছিলাম সেখানে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে, ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের জনগণের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোনো কোনো কমিশন অনলাইন সার্ভে করেছে। আন্দোলনের যে চেতনা এবং বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা; মানুষের প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করেই সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো তৈরি। সেগুলোকে আদর্শ বলছি না। তবে বৃহত্তর পরিসরের পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটাই সম্ভব ছিল।
প্রশ্ন: এত কমিশন, হাজার হাজার সুপারিশ ছিল। এজেন্ডা কি বেশি বড় হয়ে গিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের?
ইফতেখারুজ্জামান: এ নিয়ে বিতর্ক তো আছেই। কিন্তু আপনাকে ২০২৪-এর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে জনগণের দায়িত্ব দেওয়ার সময়ের কথা মনে রাখতে হবে। মূলত তিনটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল– বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন। বিচারের কাজ শুরু হয়েছে। নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে এটি বিচার, না প্রতিশোধ অথবা নির্বাচন আরও আগে হতে পারত কিনা, সেই বিতর্ক ভিন্ন প্রসঙ্গ। এখন প্রশ্ন সংস্কার নিয়ে।
দেখুন, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে ৬টি কমিশন করল। পরে আরও কয়েকটি। সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা কমিশন কোথায়? যে বিষয়কে কেন্দ্র করে এতকিছু ঘটেছে। নারী কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে শেষ দিন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো অবস্থান ছিল না। তখন প্রধান উপদেষ্টাসহ সাতজন উপদেষ্টার কাছে অনুরোধ করেছিলাম, আপনারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করুন। করেননি, বরং রিপোর্ট সরকারের নয়– এমন মন্তব্য করে একদিকে প্রতিবেদন অবমূল্যায়ন করেছে, অন্যদিকে নারীর সমঅধিকারের প্রতিপক্ষ শক্তিকে অধিকতর শক্তিশালী করেছে।
আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বলেছিলাম, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য আমাদের কাছে বিচার, মানবাধিকারের মতো যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এসেছে তার জন্য কর্মকৌশল নির্ধারণ করে অগ্রসর হতে হবে। ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে অনুরোধ করেছি। তখন অন্তর্বর্তী সরকার এসবের কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ফলে কমিশন গঠন করে মূলত কাজ হয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে। কয়েকটি কমিশন করা হয়েছে অনেকটাই লোক দেখানো। কমিশনগুলোর হাজার হাজার সুপারিশের মধ্যে সিংহভাগ হয়তো মানুষ ভুলেও যাবে।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকার কি জনগণের অনেক টাকা অহেতুক খরচ করল?
ইফতেখারুজ্জামান: এ ধরনের কাজের আর্থিক মূল্য এভাবে নির্ধারণ করা যায় না। সেই অর্থে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা না। তবে রাজনৈতিকভাবে বিশাল ক্ষতি হয়েছে। দেশের জনগণের স্বার্থে যে সংস্কারগুলো হওয়ার সুযোগ ছিল তা হলো না। এই সুযোগ হারানোই দেশের জন্য খুব বড় ক্ষতি।
প্রশ্ন: আপনি দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুদক অনেক প্রতিশোধমূলক মামলা করেছে। আবার একসঙ্গে আগের কয়েকশ মামলা তুলে নিয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান: দুদক সবসময় দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব আর আমলাতান্ত্রিকতার প্রভাবের কাছে জিম্মি। দুদকের একটা চরিত্র খুব পরিষ্কার– যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের স্পর্শ করা যাবে না। ক্ষমতার বাইরের লোকদের টেনাহেঁচড়া করতে হবে। এই সংস্কৃতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরও বেশি প্রকট হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বড় বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তির বিরুদ্ধে গত ১৬/১৭ বছর কোনোদিন টুঁ শব্দ করতে পারেনি দুদক।
তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের লন্ডনে অবৈধ সম্পদের সুনির্দিষ্ট নথি, কাগজপত্র সব প্রমাণ আমরা দুদককে দিয়েছিলাম তদন্তের জন্য। তখন দুদক কিছুই করতে পারেনি। অথচ সরকার পতনের পর ক্ষমতাচ্যুত ওই একই ব্যক্তিসহ আরও অনেকের অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করল দুদক। এটা হলো সময়ের দাবি আর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সুযোগ। ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে ৫ আগস্টের পর। আগের যারা ক্ষমতার বাইরে ছিল রাতারাতি তাদের মামলা নিষ্পন্ন করা হলো। দুদককে এই বৈশিষ্ট্য থেকে বের করার সুপারিশই দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: তাহলে দুর্নীতি দমনের নামে রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
ইফতেখারুজ্জামান: দুদক আসলে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি-সহায়ক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একাধিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে অর্থ পাচার নিয়ে। দুদক তখন কিছুই করেনি। এখন হয়তো আবার সেটি নিয়ে তদন্ত হবে। দুর্বলতা সত্ত্বেও দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ বিতর্কিত; পরিষ্কারভাবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ করা হয়েছে; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সেলরদের নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে–এসবই হচ্ছে সেই ‘আমাদের পালা’ দলীয়করণের সংস্কৃতি। দেশে এমন কোনো পেশাজীবী সংগঠন নেই, যেখানে দলীয়করণ হয়নি। ৫ আগস্ট বিকেল থেকেই মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিসরে যে দলবাজি-দখলবাজি ছিল সেটি শুধু হাত বদল হয়েছে। আমরা স্ট্রিট মব ভায়োলেন্সের কথা বলি। সচিবালয়ের কেন্দ্রস্থলে মব হয়নি? কেন হয়েছিল? এবার আমাদের পালা, তাই। আমাদের দেশের গণতন্ত্র বা সুশাসনের সব সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায় এই ‘আমাদের পালা’র কাছে।
প্রশ্ন: ত্রয়োদশ নির্বাচন তাহলে দেশের জন্য কতটুকু পরিবর্তনের আশা জাগায়?
ইফতেখারুজ্জামান: ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের প্রতিযোগিতার কারণে। বিএনপি-আওয়ামী লীগ উভয়েই এ চর্চা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হলেও শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেননি। নেপালেও তা-ই হয়েছে। তবে আমি নির্বাচনের ফলাফলের ওপর আস্থা রাখতে চাই। এখন হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। এ পর্যায়ে আজ বাংলাদেশ এসেছে ৫৪ বছরে। এত বেশি সময় লাগত না যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করা না হতো।
প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি আইন করেছে। এতে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভাজন তৈরি হলো না?
ইফতেখারুজ্জামান: নিশ্চয়ই বিভাজন। আমরা এক বাতিলের ধারা থেকে আরেক বাতিলের ধারায় যাচ্ছি। গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ একাই অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে অপসারণ করতে চেয়েছে। এখন তাদেরই এক্সক্লুড করা হচ্ছে। সমাধান হচ্ছে রিকনসিলিয়েশন বা ভুল স্বীকারের শর্তে অন্তর্ভুক্তি। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখনও অত্যন্ত প্রতিশোধপ্রবণ। আজ পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে একটি শব্দও কি বলা হয়েছে? কিন্তু পৃথিবীর কেউ কি বিশ্বাস করবে, আওয়ামী লীগ অপরাধ করেনি? আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শত্রু আওয়ামী লীগ নিজেই।
তারা কখনও ভুল স্বীকার করে না। অন্তর্বর্তী সরকার অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আওয়ামী লীগেরও কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। দুঃখজনক যে, শান্তিপূর্ণ সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা অন্তত স্বল্প মেয়াদে দেখা যাচ্ছে না। সূত্র: সমকাল

