জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি সরকারের নীতি ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট এমন এক সময়ে আসছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় বাজেটটিকে আগের চেয়ে আরও গভীরভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সামগ্রিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট, জাতীয় পুঁজি গঠনের জন্য একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা উপস্থাপন করা এবার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও অনেক প্রস্তাব বিচ্ছিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। এতে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে ৮ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান বাস্তবতায় বেশ উচ্চাভিলাষী। এর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বড় অংশ নির্ভর করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। তবে গত চার অর্থবছরে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অস্বচ্ছ করনীতি এবং করদাতাদের আস্থার ঘাটতির কারণে সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দৃঢ় উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং মধ্যবিত্ত ও পেশাজীবীদের ওপর করের চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা তাদের ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত করতে পারে।
ব্যয় খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের আলোচনা রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের দুর্বলতা এর সুফল কমিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট প্রকল্পেও অস্বাভাবিক ব্যয় দেখা যায়, যা উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।
মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের বেশি। ফলে শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু বাজেটে এ সমস্যা মোকাবিলায় নতুন বা কার্যকর কোনো উদ্যোগের ইঙ্গিত নেই। নগর রেশনিং, ভর্তুকিযুক্ত গণপরিবহন বা আবাসন সহায়তার মতো পদক্ষেপের অভাব চোখে পড়ে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও মাথাপিছু হিসাবে তা এখনো সীমিত এবং সুশাসনের প্রশ্নও রয়ে গেছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য থাকলেও বাস্তব উদ্যোগের ঘাটতি স্পষ্ট। কর প্রণোদনা ও সিঙ্গল উইন্ডো সেবার কথা বলা হলেও জমি জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক বাধা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক খাতের তারল্য সংকটের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হতে পারে। রপ্তানিমুখী খাতে কিছু সুবিধা থাকলেও ডলার সংকট ও এলসি জটিলতা বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অন্যতম বড় উদ্বেগ। খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও সুশাসন সংকট কাটাতে কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি। অথচ একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য।
বহিঃখাতেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানি আয় স্থবির, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়লেও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের কারণে পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট প্রবাসী শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব? বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে কোনো বাজেটই কার্যকর হয় না। বর্তমানে অর্থনীতি সরকারি ঋণের চাপ, বেসরকারি খাতে ঋণ সংকোচন, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাজেটটি রূপান্তরমূলক দলিল হওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত তা অনেকটাই সংখ্যার হিসাব ও প্রতিশ্রুতির তালিকায় সীমাবদ্ধ। কাঠামোগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত থাকার শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কৌশল। যেখানে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি, কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা অগ্রাধিকার পাবে। দারিদ্র্য কমাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য করহার কমিয়ে করের আওতা বাড়ানো, উদ্ভাবনী নীতি গ্রহণ এবং শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।
- মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান।

