৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিটি একাধারে একটি কূটনৈতিক সূচনা এবং একটি পরীক্ষা, যা নির্ধারণ করবে একটি স্থায়ী চুক্তির মাধ্যমে এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের অবসান ঘটানো সম্ভব কি না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, এখন খতিয়ে দেখছেন যে ইরান হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে নিতে, তেল সরবরাহ পুনরায় চালু করতে এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত কি না, যা তিনি সম্মানজনক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধে চাঞ্চল্যকরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, কীভাবে ইসরায়েলিরা ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে রাজি করিয়েছিল।
এতে উল্লেখ করা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু “এমন কিছু শর্তের রূপরেখা দিয়েছিলেন, যেগুলোকে তারা প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের ইঙ্গিতবাহী হিসেবে তুলে ধরেছিল: কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া যেতে পারে। দেশটির শাসনব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে, তারা হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রম রুদ্ধ করতে পারবে না এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন স্বার্থের ওপর ইরানের আঘাত হানার সম্ভাবনাও ছিল নগণ্য।”
প্রবন্ধটিতে মোসাদের একটি মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, “ইরানের অভ্যন্তরে রাস্তায় বিক্ষোভ আবার শুরু হবে এবং ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থার উস্কানিতে দাঙ্গা ও বিদ্রোহের ফলে একটি তীব্র বোমা হামলা ইরানি বিরোধী দলকে শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।”
মজার ব্যাপার হলো, ফিনান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার ছয় সপ্তাহ পর—ব্যাপক বোমাবর্ষণের পর এবং ৭ এপ্রিল ট্রাম্প যখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন—ঠিক সেই সময়েই হোয়াইট হাউস পাকিস্তানকে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার জন্য অনুরোধ করছিল।
যাই হোক, কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কিন বোমাবর্ষণ অভিযানটি পণ্ডিত রবার্ট জারভিসের সেই তত্ত্বের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে নেতাদের ভুল হিসাব-নিকাশের মাধ্যমেই যুদ্ধের সূচনা হয়।
ইরানের পক্ষে, ২৮শে ফেব্রুয়ারির প্রথম দফার হামলায় নিহত সাবেক ইরানি নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি এক অভূতপূর্ব মূল্য দিয়ে মোকাবিলা করা হয়েছিল। ইরানের চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রধান হোসেইন সেলাহভারজির মতে, ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি থেকে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রতিরোধক হিসেবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যর্থ হয়েছিল এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি কখনো পারমাণবিক অস্ত্রে পরিণত হয়নি।
অর্থনৈতিক ব্যাঘাত
যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের ৭০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরান বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ইস্পাত উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে অন্যতম, যা এই বিপর্যয়ের মাত্রাকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এই খাতগুলো হাজার হাজার আনুষঙ্গিক শিল্পকে টিকিয়ে রাখে; এগুলোর কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটলে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান প্রভাবিত হতে পারে। আরেকটি খাত যা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা হলো ডিজিটাল অর্থনীতি, বিশেষ করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই আরোপিত ব্যাপক ইন্টারনেট বন্ধের কারণে।
আমেরিকানরাও চাপের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক আগে, তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, কিছু ক্ষেত্রে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১৫০ ডলারের কাছাকাছি। ট্রাম্প কখনো অস্বীকার করেছেন—দাবি করেছেন, “আমাদের তেলের দরকার নেই, আমাদের নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত তেলই আছে”, যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ষাট লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করে—আবার কখনো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ইরানকে “ওই প্রণালীটা” খুলে দেওয়ার দাবি এবং ইরানের “সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে” বলে সতর্কবাণী।
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচনে একটি নির্ণায়ক বিষয় হতে পারে। পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপের কারণে ভোটারদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে রিপাবলিকানদের উদ্বেগ বাড়ছে। হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে: “ইরানের এই যুদ্ধ প্রায় নিশ্চিত করে দিয়েছে যে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমরা হেরে যাব—সিনেট এবং হাউস উভয় ক্ষেত্রেই।”
এটি ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান ক্রোধের কারণ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে, প্রতিনিধি পরিষদ অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে, অন্যদিকে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে পদ থেকে অপসারণ করা যেতে পারে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা ও কৌশলবিদরা ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে অভিশংসনের বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করছেন, যদি তারা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান।
এই যুদ্ধের প্রভাব তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপের বাইরেও সুদূরপ্রসারী হতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করবে এবং ফেডারেল রিজার্ভকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সুদের হার বেশি রাখতে বাধ্য করবে। এর ফলে বন্ধকী ঋণ থেকে শুরু করে ক্রেডিট কার্ড পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে ঋণের খরচ বাড়বে এবং ফলস্বরূপ প্রবৃদ্ধি মন্থর হবে।
ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পেট্রোডলার ব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে, কারণ তেলের উচ্চমূল্য কিছু আমদানিকারক দেশকে নগদ ডলার সংগ্রহের জন্য মার্কিন ট্রেজারি বিক্রি করতে বাধ্য করেছে, অন্যদিকে রপ্তানিকারকরা মার্কিন সম্পদে কম পেট্রোডলার পুনর্ব্যবহার করছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি একটি শান্তি চুক্তি এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের দিকে নিয়ে যেতে পারবে কি না।
নেতানিয়াহু চাপের মধ্যে
প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে একটি হলো ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নেতানিয়াহু বলেন, এই বিরতি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানের সমাপ্তি ঘটাবে না: “প্রয়োজনীয় যেকোনো মুহূর্তে আমরা যুদ্ধে ফিরতে প্রস্তুত। আমাদের আঙুল ট্রিগারে রয়েছে।”
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই, ইসরায়েল লেবাননে ১০ মিনিটের মধ্যে ১০০টি হামলা চালায়, এতে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১,১০০ জন আহত হয়। জাতিসংঘ এই হামলাকে “ভয়াবহ” বলে নিন্দা জানিয়েছে।
নেতানিয়াহু এখন দুই দিক থেকে চাপের মধ্যে আছেন: প্রথমত, ইসরায়েলি গণমাধ্যমের একাংশ তাকে যুদ্ধে পরাজিত এবং মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হিসেবে চিত্রিত করেছে, বিশেষ করে ইরান সরকারের পতন। দ্বিতীয়ত, হারেৎজ-এ যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো “বর্তমান ইরানি শাসনকে শক্তিশালী করতে এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানকে সীমিত করতে পারে”।
যখন ইরান যুদ্ধবিরতি কাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে হরমুজ খাল বন্ধ রাখার হুমকি দেয়, তখন ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সমর্থনে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন যে, এই চুক্তিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। নেতানিয়াহু নিঃসন্দেহে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলতে পারেন—এবং তিনি তা জানেন।
পাকিস্তান প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ উল্লেখ করেছেন যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র, “তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে, লেবাননসহ সর্বত্র অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে”। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, এই বিষয়ে শরীফের বক্তব্যকে রূপ দিতে হোয়াইট হাউস “সরাসরি জড়িত” ছিল।
পরে ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে বলা হয়: “আমি বিবির সঙ্গে কথা বলেছি এবং তিনি বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। আমি শুধু মনে করি আমাদের আরেকটু সংযত হওয়া উচিত”—কার্যত তিনি কূটনৈতিক ভাষাকে অভিযান বন্ধ করার চাপে রূপান্তরিত করেন।
কোনো টেকসই শান্তি সম্ভব কিনা, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ট্রাম্পই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করাই হলো মূল পরীক্ষা। প্রশাসন যদি এই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়, তবে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
পর্যবেক্ষকরা নিবিড়ভাবে লক্ষ্য রাখবেন যে, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টায় ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সংযত করতে পারেন কি না, অন্যদিকে জেডি ভ্যান্স সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন- এমনটাই ইসলামাবাদের আলোচনার আগে উঠে এসেছিল, কিন্তু শেষ অবদি আলোচনা ব্যর্থ হয়। তবে, উভয় পক্ষের জন্যই অনেক কিছু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তাই সামনের পথ বন্ধুর হলেও প্রায় অলৌকিক একটি চুক্তি এখনও হয়ে উঠতে পারে।
- শাহির শাহিদসালেস: একজন ইরানি-কানাডিয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

