বর্তমান জটিল আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন, বৈশ্বিক সংযোগ এবং আর্থিক অপরাধের নতুন কৌশলের কারণে শুধু প্রচলিত নিরীক্ষা দিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব ব্যাংকের জন্য ফরেনসিক অডিট চালু করা সময়ের দাবি।
ফরেনসিক অডিট মূলত একটি গভীর অনুসন্ধানমূলক নিরীক্ষা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম, প্রতারণা এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা শনাক্ত করা হয়। সাধারণ অডিট যেখানে কেবল হিসাবের সঠিকতা যাচাই করে, সেখানে ফরেনসিক অডিট আরও গভীরে গিয়ে লেনদেনের প্রকৃতি, ডিজিটাল তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ বিশ্লেষণ করে। এমনকি এই অডিটে সংগৃহীত তথ্য আদালতে প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য হয়।
আজকের বিশ্বায়িত ও দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থিক পরিবেশে ব্যাংক খাত নিরবচ্ছিন্ন আস্থা ও স্বচ্ছতার ওপর নির্ভরশীল। ভালো ব্যাংকগুলো প্রায়ই তাদের সততা, নৈতিকতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য পরিচিত, কিন্তু আধুনিক ব্যাংকিংয়ের জটিলতা, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং সূক্ষ্ম আর্থিক অসদাচরণের কারণে ভালো ব্যাংকগুলোর জন্য কেবল সাধারণ অডিট পর্যাপ্ত নয়, প্রয়োজন ফরেনসিক অডিট। ফরেনসিক অডিট এখন আর কেবল সন্দেহভাজন বা সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য সীমাবদ্ধ নেই—বরং এটি অতি আধুনিক ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিং পরিচালনার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত। তাই সব ব্যাংকের জন্যই ফরেনসিক অডিট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
‘ফরেনসিক অডিট’ শব্দটি শুনতে তদন্তমূলক ও জটিল মনে হলেও এর মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট: আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অসাধুতা, অনিয়ম বা ভুল চিহ্নিত করা। এটি সাধারণ আর্থিক অডিট থেকে ভিন্ন। সাধারণ অডিট যা মূলত আর্থিক প্রতিবেদনের যথার্থতা ও নীতিমালা অনুসরণের বিষয়টি পরীক্ষা করে। ফরেনসিক অডিট তার চেয়েও অনেক গভীরে যায়—এটি ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং এমনকি কর্মচারীদের আচরণ বিশ্লেষণ করে। এটি কেবল সংখ্যা নয়, বরং সংখ্যার পেছনের গল্পও বোঝার চেষ্টা করে। ফরেনসিক অডিট অনিয়মের সব প্রমাণ সংগ্রহ করে যা আদালত বা অন্যান্য আইনি কার্যক্রমে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভালো ব্যাংকগুলো তাদের সুনামের ওপরই টিকে থাকে। তবে একটি মাত্র কেলেঙ্কারি বা অভ্যন্তরীণ অনিয়ম পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে পারে। ফরেনসিক অডিট কেবল সমস্যা চিহ্নিতই করে না, বরং এটি নিয়মিতভাবে পরিচালিত হওয়ার মাধ্যমে গ্রাহক, বিনিয়োগকারী এবং নিয়ন্ত্রকদের কাছে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বার্তা প্রদান করে। শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীদের আস্থার ভিত্তি মজবুত করার জন্যও একটি নির্দিষ্ট সময় পর ফরেনসিক অডিট অপরিহার্য।
ফরেনসিক অডিটের ধরন ও পদ্ধতি- ডিজিটাল ফরেনসিকস: আইটি সিস্টেম, অনলাইন লেনদেন এবং ডেটা সুরক্ষা পরীক্ষা করা। লেনদেনভিত্তিক: সন্দেহজনক অস্বাভাবিক লেনদেনের গভীর বিশ্লেষণ। কর্মচারী আচরণ পর্যবেক্ষণ: অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি বা অনিয়ম শনাক্তকরণ। ফরেনসিক অডিট সাধারণত অগ্রগামী তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিশেষায়িত ফরেনসিক ল্যাবরেটরির মাধ্যমে সার্বিক কার্যক্রম সম্পাদন করেন।
ফরেনসিক অডিট চালু করতে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক খরচ ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের প্রয়োজন হয়। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রাথমিক পর্যায়ে সবাই ফরেনসিক অডিট নিয়ে আতঙ্কিত হয় যা মোটেও উচিত নয়। ফরেনসিক অডিট কারণ অনুসন্ধান ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই দায়িত্ব বা লাইন অব ডিফেন্স নির্ধারণ করে থাকে। আর কর্মকর্তাদের ফরেনসিক অডিট প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা না থাকায় কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। তবে চ্যালেঞ্জগুলো নিম্নলিখিত উপায়ে উত্তরণ ঘটানো যায়: নিয়মিত ফরেনসিক অডিটের সুবিধাগুলো সম্পর্কে কর্মকর্তাদের স্বচ্ছ ধারণা দেয়া; নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি, প্রক্রিয়াটি কার্যকর এবং কম হস্তক্ষেপমূলক করতে প্রযুক্তির ব্যবহার।
ফরেনসিক অডিটকে অবিশ্বাস বা দুর্বলতার চিহ্ন হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি একটি পরিপক্ব, দায়িত্বশীল এবং অগ্রগামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য। এমন এক যুগে যেখানে আর্থিক অপরাধগুলো আরো পরিশীলিত হয়ে উঠছে এবং প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, এমনকি সেরা ব্যাংকগুলোও নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না, সেক্ষেত্রে ভালো ব্যাংকগুলোর জন্য ফরেনসিক অডিট এখন আর একটি বিকল্প নয়—এটি একটি অপরিহার্য বিষয়। এটি তাদের সম্পদ সুরক্ষিত করে, তাদের সুনাম ও খ্যাতি বাড়ায় এবং আর্থিক ব্যবস্থার সামগ্রিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখে। ফরেনসিক অডিট গ্রহণ করার মাধ্যমে, ব্যাংকগুলো কেবল নিজেদেরই রক্ষা করে না, বরং সবার জন্য একটি আরো নিরাপদ এবং বিশ্বস্ত আর্থিক পরিবেশ গড়ে তুলতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এর মাধ্যমে একটি ব্যাংক কেবল তার আর্থিক স্বাস্থ্যই রক্ষা করে না, বরং এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়ও অবদান রাখে এবং তার স্টেকহোল্ডারদের স্থায়ী আস্থা আর্জন করে। এছাড়া ফরেনসিক অডিট ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করতে এবং ব্যাংক খাতের সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ফাংশনাল অডিটের সঙ্গে ফরেনসিক অডিট একটি ব্যাংকের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার জন্য জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে রিস্ক বেজড সুপারভিশনের সঙ্গে ফরেনসিক অডিটের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রয়োজন, যা ব্যাংক খাতকে আরো সুসংহত করবে। ফরেনসিক অডিট কেবল হিসাববিজ্ঞানের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে তার কাজ সম্পাদন করে না বা সিদ্ধান্ত প্রদান করে না। মানবসম্পদসহ তথ্যপ্রযুক্তি, এমনকি অনিয়ম ও আর্থিক দূর্নীতির উৎস উদ্ঘাটনে ফরেনসিক ল্যাবরেটরির মাধ্যমে বিশাল ভূমিকা রাখে ফরেনসিক অডিট। এ ধরনের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ফরেনসিক অডিট অন্য যেকোনো ধরনের অডিটের চেয়ে আলাদ।

