চলমান ইরান–ইসরায়েল সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নয়, বরং ধীরে ধীরে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ—এই তিনটি প্রধান কারণে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর কাছে সংঘটিত হামলাসহ চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌপথে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে সক্রিয় ঔষধীয় উপাদান (API) আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্রিয় উপাদানের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি দেশের ওষুধ শিল্পকে প্রভাবিত করে। ইতোমধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে, যার ফলে মাল পরিবহনের খরচ বেড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য কাঁচামাল সংকটের কারণে ওষুধ উৎপাদনের সামগ্রিক খরচও বাড়ছে। প্যারাসিটামল ও মেটফর্মিনের মতো বহুল ব্যবহৃত ওষুধের প্রধান কাঁচামালের দাম ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধ আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানিকৃত এলএনজি (LNG)-এর ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তেল ও এলএনজির দামে তীব্র বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বিদ্যুৎ হাসপাতাল এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য অপরিহার্য।
বর্ধিত চিকিৎসা ব্যয় এবং জ্বালানির মূল্যস্ফীতির চাপ একসঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে। সংঘাতের প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বহু বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে। রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বহু পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রধান উৎস হওয়ায় এর বিঘ্ন তাদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিক থেকেও এই সংঘাত গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ হলে চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে এবং ব্যাপক শরণার্থী প্রবাহ সৃষ্টি হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আঞ্চলিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) কার্যক্রম পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে রোগের ঝুঁকি ও স্বাস্থ্য সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে।
ইরানি ও আঞ্চলিক অবকাঠামোর ওপর হামলা হাসপাতাল, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এতে বড় পরিসরের জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম প্রয়োজন হবে, যার চাপ পরোক্ষভাবে বাংলাদেশেও পড়তে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতি তেল ও গ্যাসের দাম বিশ্বব্যাপী বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে হাসপাতাল পরিচালনা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য উদ্যোগ সমন্বয়ের সক্ষমতাকেও জটিল করে তোলে। নিরাপত্তাহীনতা বাড়লে মনোযোগ স্বাস্থ্য উন্নয়ন থেকে জরুরি সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে সরে যায়। থিঙ্ক গ্লোবাল হেলথ, ডেভেক্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান–ইসরায়েল সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়, বরং একটি উদীয়মান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
এর প্রাথমিক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা, মানবিক সহায়তা, খাদ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন এবং দুর্বল দেশগুলোর সেবা ব্যবস্থায়। বিশেষ করে ওষুধ পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় আকাশপথে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ওষুধের দামও বাড়ছে। জরুরি ও সংবেদনশীল চিকিৎসা সামগ্রী—যেমন ভ্যাকসিন, ইনসুলিন, বায়োলজিকস ও ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ—এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, নিরাপত্তাহীনতা, আকাশপথে সীমাবদ্ধতা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহনে বাধার কারণে দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি সরবরাহ কেন্দ্র কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে প্রায় ১৮ মিলিয়ন ডলারের মানবিক স্বাস্থ্য সামগ্রী গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। আরও ৮ মিলিয়ন ডলারের চালান আটকে আছে এবং ২৫টি দেশের ৫০টিরও বেশি জরুরি সরবরাহ অনুরোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে পোলিও পরীক্ষাগারের সরঞ্জামও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বিকল্প সরবরাহ পথ হিসেবে জাতিসংঘের অন্যান্য কেন্দ্র ও স্থলপথ ব্যবহার করছে। যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবাতেও সরাসরি পড়ছে। নিয়মিত চিকিৎসা, টিকাদান কর্মসূচি, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা এবং মানবিক সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া হিলিয়াম প্ল্যান্টে আঘাতের কারণে এমআরআই মেশিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গ্যাস সংকট সার উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ফসল উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি বাড়াতে পারে—বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। এই ধাক্কা স্বাস্থ্য গবেষণা ও উন্নয়ন খাতেও প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যে সীমিত তহবিল আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর স্বাস্থ্য অগ্রগতিকে ধীর করে দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় অংশ এখনও কিছু নির্দিষ্ট সরবরাহ করিডোর, সাহায্য চ্যানেল এবং জরুরি কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই যুদ্ধকে শুধু ভূরাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি নির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতও এই সংঘাতের বহুমাত্রিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
- ডা. গোলাম শওকত হোসেন: চিকিৎসক, গবেষক ও লেখক

