কোনো ঘটনা জানতে আমরা আগে সংবাদপত্রের ওয়েবসাইটে যেতাম, টিভির খবর দেখতাম, কিংবা সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজে একাধিক প্রতিবেদন পড়তাম। এখন প্রশ্নটা সরাসরি চলে যাচ্ছে এআই চ্যাটবটের কাছে। কয়েক সেকেন্ডেই মিলছে গুছিয়ে সাজানো উত্তর। পাঠকের জন্য এটি সুবিধাজনক, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে সাংবাদিকতার সামনে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে।
যে কাজ এআই করে না
এআই নিজে মাঠে যায় না। মন্ত্রণালয়ের নথি সংগ্রহ করে না, আদালতের বারান্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে না, প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের মুখোমুখি বসে না, দুর্নীতির তথ্যও যাচাই করে না। এই কাজগুলো করেন সাংবাদিকরা। অনুসন্ধান, সাক্ষাৎকার, যাচাই, সম্পাদনা ও প্রকাশের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যে তথ্য তৈরি হয়, এআইয়ের উত্তর দাঁড়িয়ে থাকে সেই তথ্যেরই ওপর। অর্থাৎ এআই যত নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে চায়, তার তত বেশি দরকার নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা।
অদ্ভুত বৈপরীত্য
সমস্যা হলো, পাঠক যদি সংবাদমাধ্যমে না গিয়ে এআইয়ের সারাংশ পড়েই সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ওয়েব ট্রাফিক কমবে। ট্রাফিক কমলে কমবে বিজ্ঞাপন ও সাবস্ক্রিপশনের আয়। আর আয় কমলে সবচেয়ে আগে চাপে পড়বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল অথচ সবচেয়ে জরুরি কাজগুলো: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং ও তথ্য যাচাই।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, যে সাংবাদিকতা এআইকে তথ্য জোগাচ্ছে, সেটিই দুর্বল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতের এআই ভরসা করবে কোন তথ্যের ওপর?
পাঠকের চোখের আড়ালের শ্রম
একটি প্রতিবেদনের পেছনের শ্রমের বড় অংশ পাঠক দেখতে পান না। একটি তথ্যের জন্য প্রতিবেদক হয়তো দশটি ফোন করেন, পাঁচটি নথি জোগাড় করেন, কয়েকজনের বক্তব্য মিলিয়ে দেখেন। একটি ছোট ভুল এড়াতে সম্পাদক ও প্রতিবেদক একাধিকবার যাচাই করেন। পাঠকের সামনে শেষ পর্যন্ত থাকে কয়েকশ শব্দের একটি লেখা। এআই সেই লেখা থেকে কয়েক লাইনের উত্তর বানিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু ওই কয়েক লাইনের পেছনের মানবিক শ্রম, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও পেশাগত দক্ষতার মূল্য কে দেবে?
এটি শুধু ব্যবসার প্রশ্ন নয়
এই প্রশ্ন সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক স্বার্থের চেয়েও বড়, এটি জনস্বার্থের প্রশ্ন। সাংবাদিকতা দুর্বল হলে সমাজে যাচাই করা তথ্যের জোগান কমবে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, রাজনৈতিক প্রচারণা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য। এআই যদি এমন দুর্বল তথ্যভাণ্ডার থেকে উত্তর তৈরি করে, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, ফল নির্ভরযোগ্য হবে না।
তাই আসল লড়াইটা ‘এআই বনাম সাংবাদিকতা’ নয়। প্রশ্ন হলো, এই দুইয়ের সম্পর্ক কীভাবে ন্যায্য ও টেকসই করা যায়।
দায়িত্ব দুই পক্ষেরই
এআই কোম্পানিগুলোকে সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কাঠামো তৈরি করতে হবে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য থেকে যদি তারা অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, তাহলে সেই তথ্য তৈরিতে যারা বিনিয়োগ করেছে, তাদের ন্যায্য অংশীদারত্বের প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। উত্তরের সঙ্গে মূল সংবাদসূত্রের নাম ও লিংক দৃশ্যমান রাখার ব্যবস্থাও থাকা উচিত, যাতে পাঠক চাইলে সরাসরি মূল প্রতিবেদনে যেতে পারেন।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমও পুরনো ব্যবসায়িক মডেল আঁকড়ে থাকলে টিকবে না। কেবল দ্রুত খবর দেওয়ার প্রতিযোগিতায় যন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। দরকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশেষায়িত বিশ্লেষণ, ডেটা সাংবাদিকতা এবং পাঠকের জন্য এমন বাড়তি মূল্য, যা এআই সহজে দিতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
আমাদের দেশে অনেক সংবাদমাধ্যম আগে থেকেই সীমিত আয়, বিজ্ঞাপননির্ভরতা ও কর্মী সংকটে ভুগছে। এআই যদি পাঠক ও সংবাদমাধ্যমের সরাসরি সম্পর্ক আরও ক্ষীণ করে দেয়, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো পড়বে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে। তাই নীতি-আলোচনা শুরু করতে হবে এখনই।
সহায়ক, বিকল্প নয়
এআইকে দেখতে হবে সাংবাদিকতার বিকল্প হিসেবে নয়, সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে। সে নথি বিশ্লেষণে সাহায্য করতে পারে, বড় ডেটাসেট থেকে তথ্য খুঁজে দিতে পারে, অনুবাদ ও তথ্য সাজানো সহজ করতে পারে। কিন্তু সত্যতা যাচাই, নৈতিক সিদ্ধান্ত, উৎসের নিরাপত্তা, মানবিক প্রেক্ষাপট ও জনস্বার্থের প্রশ্নে মানুষের ভূমিকা এখনো অপরিহার্য।
ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা হয়তো আগের মতো থাকবে না, কিন্তু সাংবাদিকতার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এআই যত শক্তিশালী হবে, নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন তথ্যের চাহিদা তত বাড়বে।
আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সংকট তথ্যের অভাব নয়, বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের উৎসের অভাব। সেই সংকট এলে সবচেয়ে উন্নত এআইও আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।

