আজ বিশ্ব তুলা দিবস
তুলা শুধু একটি প্রাকৃতিক তন্তু বা কৃষিপণ্য নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। সাদা রঙের এই আঁশকে অনেক সময় ‘সাদা সোনা’ বলা হয়, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের জীবিকা, বিশাল শিল্পখাত এবং বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য।
প্রতি বছর ৭ অক্টোবর বিশ্ব তুলা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো, তুলা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষক, শ্রমিক ও শিল্পের অবদান তুলে ধরা এবং এই খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা তৈরি করা।
বিশ্বজুড়ে তুলার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে তুলা চাষ হয়। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ মিলিয়ন টন তুলা উৎপাদিত হয়। চীন, ভারত, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান তুলা উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক। তুলা শুধু পোশাক তৈরির কাঁচামাল নয়; তুলাবীজ থেকে তেল, পশুখাদ্য, চিকিৎসা ও বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। ফলে তুলাকে ঘিরে কৃষি থেকে শুরু করে জিনিং, সুতা, বয়ন ও পোশাক উৎপাদন পর্যন্ত একটি দীর্ঘ অর্থনৈতিক শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য তুলার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প, আর এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো তুলা। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও তুলা উৎপাদনে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। দেশের বিশাল চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন খুবই সীমিত। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর যেখানে বাংলাদেশের তুলার চাহিদা প্রায় ৭৮ থেকে ৮৫ লাখ বেলের কাছাকাছি (প্রতি বেল প্রায় ২১৮ কেজি), সেখানে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র কয়েক লাখ বেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি তুলাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। শুধু কাঁচা তুলা আমদানিতেই প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এটি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।
অর্থাৎ, বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েও বাংলাদেশকে শুধু কাঁচামালের জন্য বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাঠাতে হচ্ছে। অন্য দেশ যদি তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের শিল্পকে শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে আমাদেরও কৃষি ও শিল্পের সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আত্মনির্ভর শিল্প গড়ার জন্য আমাদের সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আসলে কোথায়?
এই আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য বড় একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম ওঠানামা করলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের স্পিনিং, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পে। বৈশ্বিক বাজারে তুলার দাম বৃদ্ধি, ডলারের সংকট বা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে রপ্তানি সক্ষমতা ও শিল্পের প্রতিযোগিতার ওপর। প্রশ্ন হলো, যে দেশ বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক, সে দেশ এখনো কেন তার প্রধান কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল?
|
তবে বাংলাদেশের জন্য তুলা খাতে সম্ভাবনাও কম নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুলা চাষের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় তুলা চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল ও পার্বত্য এলাকার কিছু জায়গায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ, কৃষক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তুলা চাষে কৃষকদের আগ্রহ কতটা বাড়ানো যাচ্ছে? কারণ কৃষকের কাছে শুধু উৎপাদন নয়, লাভজনক মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ। ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় তুলা চাষে সময় বেশি লাগে এবং ঝুঁকিও রয়েছে। রোগবালাই, আবহাওয়ার পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যা থাকলে কৃষক সহজেই অন্য ফসলে চলে যেতে পারেন। তাই শুধু উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনও তুলা খাতের জন্য বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানির সংকট তুলা উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের অনেক দেশ এখন জলবায়ু সহনশীল তুলার জাত, কম পানি ব্যবহারকারী প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতির দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে, বিশ্ব তুলা বাজারও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম তন্তু বা সিনথেটিক ফাইবারের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক তুলার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। কম উৎপাদন ব্যয় এবং বহুমুখী ব্যবহারের কারণে অনেক শিল্পে কৃত্রিম তন্তুর চাহিদা বাড়ছে। ফলে তুলা খাতকে টিকে থাকতে হলে মানসম্পন্ন উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব চাষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার দিকে যেতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য তুলা উৎপাদন বাড়ানোর আরেকটি বড় সুবিধা হলো কৃষি ও শিল্পের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করা। দেশে যদি তুলার স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে কৃষক নতুন আয়ের উৎস পাবেন, অন্যদিকে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামালের একটি অংশ দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং দেশের টেক্সটাইল শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ একা তুলা উৎপাদন করে পুরো চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। দেশের জমি, কৃষি কাঠামো এবং শিল্পের বিশাল আকার বিবেচনায় আমদানি নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করা কঠিন। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদনের অংশ বাড়ানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা- উন্নত জাতের বীজ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, বাজার নিশ্চয়তা এবং কৃষক থেকে শিল্প পর্যন্ত কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা।
বিশ্ব তুলা দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ। বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েও আমরা কেন এখনো প্রধান কাঁচামালের জন্য এত বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল? কীভাবে কৃষক, শিল্প ও অর্থনীতির মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যায়?
তুলার ছোট্ট একটি আঁশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কৃষকের সম্ভাবনা, শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং দেশের শিল্প অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করা গেলে তুলা শুধু একটি আমদানিনির্ভর কাঁচামাল নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পের মধ্যে নতুন এক সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই হতে পারে বিশ্ব তুলা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
- এফ.আর. ইমরান, সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক

