চোখ মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়গুলোর একটি। পৃথিবীকে দেখা, শেখা, কাজ করা, নিজের স্বাভাবিক জীবন পরিচালনাসহ সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে দৃষ্টিশক্তি। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কতটা সচেতন? আর একজন মানুষ যখন চোখের সমস্যায় আক্রান্ত হন, তখন তিনি কতটা সহজে সঠিক চিকিৎসা পান? বিশ্ব দৃষ্টি দিবসে এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে আসে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষের দৃষ্টিজনিত সমস্যা এমন, যা সময়মতো চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার বা একটি সাধারণ চশমার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। অর্থাৎ অনেক মানুষ অন্ধত্ব বা গুরুতর দৃষ্টি সমস্যার শিকার হচ্ছেন শুধুমাত্র চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সচেতনতার অভাব কিংবা সময়মতো সেবা না পাওয়ার কারণে।
বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সমস্যার বাইরে নয়। দেশের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ কোনো না কোনো ধরনের দৃষ্টিসমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আক্রান্ত ছানি, দৃষ্টির ত্রুটি, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, গ্লুকোমা ও বয়সজনিত চোখের সমস্যায়। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য বলছে, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চোখের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসছেন। শুধু জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটেই প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
প্রতিরোধযোগ্য, তবুও কেন বাড়ছে চোখের রোগী?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, চোখের অনেক সমস্যা শুরুতে তেমন বোঝা যায় না। বিশেষ করে গ্লুকোমা বা ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির মতো রোগ ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন রোগী বুঝতে পারেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে দেরি হয়ে যায়। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করার অভ্যাস না থাকা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে অনেক মানুষ স্থায়ী দৃষ্টিহানির ঝুঁকিতে পড়েন।
বাংলাদেশে অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ এখনো ছানি। অথচ ছানি এমন একটি সমস্যা, যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব। জাতীয় অন্ধত্ব জরিপ-২০২০ অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৩ জন মানুষ অন্ধত্ব নিয়ে বসবাস করছেন। এর মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের অন্ধত্বের কারণ ছানি।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন। অথচ প্রতিবছর নতুন করে এক লাখের বেশি মানুষ ছানির রোগী হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে বছরে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ রোগীর ছানি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা থাকলেও জমে থাকা রোগীর সংখ্যা কমাতে আরও বড় উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর নতুন করে কত মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন, এর নির্ভুল জাতীয় পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশিত না হলেও বিভিন্ন গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ প্রতিরোধযোগ্য কারণেই দৃষ্টিহানির শিকার হচ্ছেন।
এখানেই বড় প্রশ্ন হলো, যে অন্ধত্বের বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য, সেখানে বাংলাদেশে এখনো এত মানুষ কেন দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন?
চোখের চিকিৎসায় অগ্রগতি থাকলেও সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে কতটা?
বাংলাদেশের চোখের চিকিৎসা ব্যবস্থায় অবশ্যই অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে চক্ষু সেবা চালু রয়েছে। পাশাপাশি ব্র্যাক, সাইটসেভার্স, অরবিস, ফ্রেড হোলোস ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চক্ষু সেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ চশমা, ছানি অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন।
কিন্তু সমস্যা হলো, চাহিদার তুলনায় এই সেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ চক্ষু বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং সহজলভ্য চিকিৎসা সুবিধা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। দেশে নিবন্ধিত চক্ষু বিশেষজ্ঞ দুই হাজারের বেশি হলেও ছানি অস্ত্রোপচারে সক্রিয় ও অভিজ্ঞ সার্জনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বিশেষ করে গ্রাম ও শহরের মধ্যে চোখের চিকিৎসার সুযোগের বড় বৈষম্য রয়েছে। ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনো সাধারণ চোখের পরীক্ষার জন্যও সহজে চিকিৎসক পান না। অনেক সময় একজন রোগীকে জেলা শহর থেকে ঢাকায় আসতে হয়। যাতায়াত, থাকা ও চিকিৎসা খরচ মিলিয়ে দরিদ্র মানুষের জন্য এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন হলো, চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্যসেবা কি শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক থাকবে, নাকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সমান সুযোগ পাবেন?
ডায়াবেটিস, জীবনযাপন ও নতুন চোখের ঝুঁকি
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে চোখের রেটিনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে, যা ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এখনো অনেক ডায়াবেটিস রোগী নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান না। ফলে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।
প্রশ্ন হলো, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ডায়াবেটিস রোগীর নিয়মিত চোখ পরীক্ষাকে কেন আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা যাচ্ছে না?
শুধু ডায়াবেটিস নয়, শিশু ও তরুণদের মধ্যেও চোখের সমস্যা বাড়ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে চোখে চাপ, শুষ্কতা এবং দৃষ্টির সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অথচ স্কুল পর্যায়ে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা এখনো ব্যাপকভাবে চালু হয়নি।
চোখের চিকিৎসায় বিদেশমুখিতা কেন?
শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, চিকিৎসার ব্যয়ও একটি বড় বিষয়। গুরুতর চোখের সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক রোগী বিদেশমুখী হন। বিশেষ করে জটিল রেটিনা চিকিৎসা, কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বা কিছু উন্নত প্রযুক্তির চিকিৎসার জন্য অনেকে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যান। এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়।
একটি প্রশ্নটি এখানে স্বাভাবিকভাবেই আসে- যে চিকিৎসা প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যান্য দেশে সম্ভব, বাংলাদেশে কেন সেটি আরও বিস্তৃতভাবে তৈরি করা যাচ্ছে না? কেন একজন রোগীকে নিজের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না! বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবতে হয়? নাকি আমরা আস্থা তৈরি করতে পারছি না?
বাংলাদেশে দক্ষ চিকিৎসক ও আধুনিক হাসপাতাল রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি এখনো রয়েছে।
রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যখাতের সামনে পরীক্ষা
চোখের চিকিৎসাকে শুধু রোগ হওয়ার পরের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। স্কুল পর্যায়ে শিশুদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত রেটিনা পরীক্ষা, গ্রাম পর্যায়ে চক্ষু স্ক্রিনিং কার্যক্রম এবং সাশ্রয়ী মূল্যে চশমা সরবরাহের বিষয়কে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দৃষ্টিশক্তি হারানো সবসময় ভাগ্যের বিষয় নয়; অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সবার সচেতনতা এবং সবার জন্য সমান সুযোগভিত্তিক চক্ষু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে, প্রযুক্তিগতভাবেও এগোচ্ছে। দেশের তৈরি পোশাক, অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে আমরা বড় সক্ষমতা দেখিয়েছি। তাহলে মানুষের চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবায় কেন এখনো এত সীমাবদ্ধতা থাকবে?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু চিকিৎসার নয়, মানুষের জীবনমানের। একজন শিশু যদি চোখের সমস্যার কারণে ভালোভাবে পড়তে না পারে, একজন কর্মক্ষম মানুষ যদি দৃষ্টিশক্তির কারণে কাজ হারান, কিংবা একজন বৃদ্ধ যদি চিকিৎসার অভাবে অন্ধত্বের দিকে এগিয়ে যান- তাহলে এর প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির ওপর পড়ে না, পুরো পরিবার ও সমাজের ওপর পড়ে।
বিশ্ব দৃষ্টি দিবসে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি শুধু চোখের রোগের চিকিৎসা করবে, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করবে যেখানে মানুষ সময়মতো সেবা পেয়ে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আগেই নিরাপদ থাকতে পারে?
কারণ চোখের আলো হারানো মানে শুধু দেখার ক্ষমতা হারানো নয়; এটি একজন মানুষের স্বাধীনতা, স্বপ্ন এবং স্বাভাবিক জীবনের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাওয়া।
- এফ.আর. ইমরান, সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক

