১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভের পাশে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। ঘটনাস্থল থেকে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু নিখোঁজ ছিলেন ১১ জন। একজন বাকি ছিলেন, আশুলিয়ার স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তা। ২৭ অক্টোবর, আগুনের ১০ দিন পর, ফায়ার সার্ভিস টিনের পাত সরিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। এই দেরির জবাব এখনো কেউ দেয়নি।
যা ঘটেছিল
আগুন লাগার পর প্রথম দিনেই ১০টি মরদেহ মিললেও নিখোঁজ থেকে যান একজন। পরদিন বিকেলে ফায়ার সার্ভিস দ্বিতীয় দফা অভিযান চালায়, কিন্তু রিসোর্টটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ায় সেটি এগোয়নি। এরপর সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হলো। উদ্ধার হওয়া কোনো মরদেহের ডিএনএ মুক্তার সঙ্গে মেলেনি। তখনই নতুন করে তল্লাশি শুরু হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তল্লাশি চালানো হয় নিখোঁজ নারীর স্বজনদের দেখিয়ে দেওয়া জায়গায়, যা তাঁর থাকার কক্ষের ঠিক বিপরীতে। স্বামী দোতলার সেই কক্ষটি দেখিয়ে দেন, যেখানে মুক্তা ও তাঁর বন্ধুরা ছিলেন। দেহাবশেষ পাওয়া যায় দোতলার রেস্তোরাঁ অংশের এক কোণে, মূল ধ্বংসস্তূপের বাইরে। স্বামী গলার চেইন ও লকেট দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার পর হবে।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা এবং তার সীমা
প্রশাসনের বক্তব্য, আগুন জ্বলার সময় ওই এলাকা বিপজ্জনক ও কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তাই আগে তল্লাশি সম্ভব হয়নি। প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা দিনের জন্য এটি যুক্তিসংগত। কাঠের ভবন পুড়ে দুর্বল হলে উদ্ধারকর্মীর নিজের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। এ কথা মেনে নিয়েও কয়েকটি প্রশ্ন থাকে।
প্রথমত, ঝুঁকি থাকলে তা কমানোর পথ কী ছিল? কাঠামো স্থিতিশীল করা, যন্ত্র আনা বা বিশেষজ্ঞ দল ডাকার কোনো উদ্যোগের খবর প্রকাশ্যে আসেনি। দ্বিতীয়ত, ১১তম নিখোঁজ ব্যক্তির কথা প্রথম দিন থেকেই জানা ছিল। তাঁর সন্ধান পুনরায় শুরু হলো ডিএনএ প্রতিবেদনে অমিল ধরা পড়ার পর, ১০ দিন গড়িয়ে। অথচ ডিএনএ পরীক্ষায় তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগতে পারে বলে আগেই জানানো হয়েছিল। তৃতীয়ত, যে অংশ থেকে দেহাবশেষ মিলেছে সেটি মূল ধ্বংসস্তূপের বাইরে। স্বজনেরা যখন জায়গাটি চিনিয়ে দিতে পারলেন, তখন প্রশ্ন ওঠে, প্রথমেই নিখোঁজ ব্যক্তির থাকার কক্ষ ধরে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা কেন হয়নি?
এটি ব্যক্তির গাফিলতির চেয়ে ব্যবস্থার ব্যর্থতা। নিখোঁজ ব্যক্তি খোঁজার জন্য কোনো প্রটোকল ছিল বলে মনে হয় না। কাউকে পাওয়া না গেলে কী করতে হবে, কত দিনের মধ্যে, কে দায়িত্বে থাকবে, তা ঠিক করা ছিল না। দেশের প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডে এই শূন্যতা বারবার ধরা পড়ে।
আসল প্রশ্ন শুরু আগুনের আগে
এই মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত কি না, সেই প্রশ্ন আরও গুরুতর। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চার মাস আগে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। কাঠের তৈরি এই রিসোর্টে কক্ষ ছিল ৯টি, আগুনের সময় পর্যটক ছিলেন ২৭ জন।
অর্থাৎ ঝুঁকি চিহ্নিত ছিল, সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সতর্কতা অগ্রাহ্য করে ব্যবসা চলেছে। সতর্ক করা আর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এক জিনিস নয়। লাইসেন্সবিহীন কাঠের ভবনে ২৭ জন পর্যটক রাত কাটালেন, অথচ কেউ সেটি বন্ধ করেনি। এই অকার্যকর নজরদারিই দুটি পরিবারের ১০ জনের প্রাণ নিল। মুক্তা এগারোতম।
ঘটনার রাতে অবহেলার অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রধান আসামি রিসোর্ট মালিক পলাতক, গ্রেপ্তার হয়েছেন সহকারী ব্যবস্থাপক। মালিক এখনো ধরা পড়েননি, ছোট কর্মকর্তা আটক, এই চিত্র আমাদের চেনা। আর জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে কী আছে, জনসমক্ষে তা এখনো আসেনি।
পরিবারগুলোর দশ দিন
মুক্তার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। একজন স্বামী দশ দিন ধরে হাসপাতাল, থানা আর ঘটনাস্থলের মধ্যে ছুটেছেন। শেষ পর্যন্ত নিজেই দেখিয়ে দিয়েছেন কোথায় খুঁজতে হবে। শোকের ওপর আরেকটি বোঝা চাপে, যখন প্রিয়জনের দেহ খুঁজে দেওয়ার দায় পরিবারের কাঁধে এসে পড়ে।
কী করা উচিত
- ধ্বংসস্তূপ তল্লাশির জাতীয় মানদণ্ড চাই। নিখোঁজের তালিকা মেলানো, ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো সুরক্ষিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রতিটি কক্ষ তল্লাশির নিয়ম থাকতে হবে।
- প্রথম দিনেই নিখোঁজ ব্যক্তির সর্বশেষ অবস্থান ও থাকার কক্ষ জেনে স্বজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে তল্লাশি চালানো উচিত।
- আগের তল্লাশিগুলো কীভাবে হয়েছিল, তা তদন্ত করে প্রকাশ করতে হবে।
- লাইসেন্সবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্ট বন্ধের ক্ষমতা কার হাতে, সেটি স্পষ্ট করতে হবে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ জুড়ে এমন আরও স্থাপনা থাকতে পারে।
- পলাতক মালিককে দ্রুত আইনের আওতায় আনা দরকার।
আঙুল তোলার দায় রাষ্ট্রের
কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে একজন নারীকে দশ দিন ধ্বংসস্তূপে ফেলে রেখেছিলেন, এমন প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃত না হলেও এই অবহেলা ক্ষমার যোগ্য নয়। আগুন যাদের প্রাণ নিল, তাদের ফেরানো যাবে না। আমরা শুধু নিশ্চিত করতে পারি, পরের বার যেন কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজে দেওয়ার জন্য নিজেদের আঙুল তুলতে না হয়।

