একটি ফোনকলে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন বদলে যায়। রাশিয়ায় কাজের আশায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের অনেকে এখন রুশ বাহিনীর হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে, আর কারও কারও খবর আসছে মৃত্যুর সংবাদ হয়ে।
যে খবর পরিবারে পৌঁছায়
ছেলের পাঠানো টাকায় সংসারের অভাব ঘুচবে, ঋণের বোঝা নামবে, ঈদে মা-বাবার জন্য নতুন কাপড় কেনা হবে। এই আশাতেই বহু পরিবার জমি বন্ধক রাখে, সমিতির কিস্তি তোলে, ধারদেনা করে। অথচ সেই ছেলের খবর আসে যুদ্ধের ময়দান থেকে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধে পাঠানোর আগের দিন তিনি দেশে থাকা ছোট ভাইকে ফোন করে বলেছিলেন, আর দেখা না-ও হতে পারে। ১৭ অক্টোবর তাঁর রাইফেল হাতে জঙ্গলে দাঁড়ানো একটি ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়, কারণ তিনি আর বেঁচে নেই।
মামুনের গল্প ব্যতিক্রম নয়।
এটি একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতার একটি মুখ মাত্র।
সংখ্যার আড়ালের চিত্র
রাশিয়াগামী কর্মীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু তাঁদের কে কোথায় আছেন, তার নিশ্চিত হিসাব রাষ্ট্রের হাতে নেই।
সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, রাশিয়া যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন:
| বছর | ছাড়পত্রপ্রাপ্ত (জন) |
| ২০২৩ | ৩৭ |
| ২০২৪ | ১,৩৯৫ |
| ২০২৫ | ৪,৭২৫ |
| ২০২৬ (১৫ অক্টোবর পর্যন্ত) | ৩,১০৫ |

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির হিসাবে গত দুই বছরে অবৈধ পথে প্রায় ৮,৫০০ বাংলাদেশি রাশিয়া গেছেন। সরকারি তথ্যে একই সময়ে কর্মসংস্থানের জন্য অন্তত ৭,৯৪৯টি ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। উৎসভেদে সংখ্যা ভিন্ন, আর যাঁরা গেছেন তাঁদের অবস্থান নিয়ে নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।
মৃত্যুর হিসাবও খণ্ডিত:
• ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস মার্চে জানায়, চলতি বছর রাশিয়ার হয়ে লড়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে তখন পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত।
• স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ১৪ অক্টোবর জানায়, ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে জুনে যুদ্ধে পাঠানো ৩০ জনের অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য তারা পেয়েছে।
• প্রথম আলোর প্রতিবেদনে গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর খবর আছে। আরও অনেকে নিখোঁজ।
বেসরকারি সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, পাচারের পথে যাওয়া বেশির ভাগই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। প্রতি ২০ জনের মধ্যে ৫ থেকে ৮ জনের মরদেহের সন্ধান মিলতে পারে। এই অনুপাতটি বেসরকারি অনুমান, যাচাইকৃত সরকারি পরিসংখ্যান নয়।
কেন যান তরুণেরা
মূল কারণ অভাব, ঋণ আর দেশে কাজের অনিশ্চয়তা। জীবিকার আশায় বিদেশে যাওয়া তরুণ অনেক সময় জানেনই না, কোন পথে তিনি কোন কাজে ঢুকছেন।
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে, পাচারের পথে রাশিয়া যেতে কোন এজেন্সি জড়িত, কী কী কথা বলা হয় এবং কোন কাজের লোভ দেখানো হয়। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিতে নেওয়া মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হলে সেটি আর সাধারণ অভিবাসন থাকে না; সেখানে প্রতারণা ও পাচারের উপাদান স্পষ্ট।
পরিবারগুলোর ক্ষতি দ্বিগুণ। ছেলেকে হারানোর সঙ্গে থেকে যায় কিস্তির চাপ, বন্ধক রাখা জমি, আর যে আয়ের আশায় এত ঝুঁকি নেওয়া হয়েছিল তার অনুপস্থিতি।

রাষ্ট্রের দায় ও করণীয়
ছাড়পত্র দেওয়া এবং কে কোথায় কাজ করছেন তা জানা, এই দুইয়ের মধ্যে রাষ্ট্রের ফাঁক এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। করণীয়গুলো হতে পারে এমন:
- রাশিয়াগামী কর্মীদের কাজের ধরন, নিয়োগকর্তা ও গন্তব্য যাচাই করা এবং ছাড়পত্র দেওয়ার আগে ঝুঁকির তথ্য জানানো।
- পাচারকারী চক্র ও জড়িত এজেন্সির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
- নিহত ও নিখোঁজদের নাম, সংখ্যা ও অবস্থান নিয়ে একটি সমন্বিত সরকারি তালিকা রাখা এবং পরিবারগুলোকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া।
- রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে মরদেহ ফেরত আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঋণ-সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
- দেশেই নিরাপদ কর্মসংস্থান ও বৈধ অভিবাসনের বিকল্প বাড়ানো, যাতে ঋণ করে অনিশ্চিত পথে যাওয়ার তাড়না কমে।
তরুণদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা: বিদেশে চাকরির প্রস্তাব এলে নিয়োগকর্তা, চুক্তি ও কাজের ধরন যাচাই করুন, আর অনিবন্ধিত দালালের হাতে টাকা তুলে দেবেন না।
প্রতিটি নামের উত্তর চাই
যাঁরা জীবিকার খোঁজে দেশ ছাড়েন, তাঁরা শ্রমিক হিসেবেই যান; যুদ্ধের সৈনিক হওয়ার কথা ছিল না। এই পরিণতির দায় শুধু ব্যক্তির নয়, দালালচক্র আর রাষ্ট্রের নজরদারির ঘাটতিরও। প্রতিটি নাম ও পরিবারের জন্য উত্তর খোঁজাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

