মজুরি ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন শুরু হলেই প্রশ্ন ওঠে, আন্দোলনকারীরা প্রকৃত শ্রমিক কি না। এই সন্দেহের আড়ালে চাপা পড়ে যায় শ্রমিকের ন্যায্য দাবি, কর্মপরিবেশ ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা।
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন আবারও বাংলাদেশের শ্রমনীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে। শ্রমিকদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। অথচ আন্দোলনের কয়েক দিনের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বহিরাগত, রাজনৈতিক উসকানি ও নাশকতার অভিযোগ।
পুলিশের দাবি, মজুরি আন্দোলনের মধ্যে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঢুকে নাশকতা চালাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে দেখা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও জরুরি: কেউ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হলেই কি তার শ্রমিক পরিচয় বাতিল হয়ে যায়?
শ্রমিকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে, এমনকি কোনো আন্দোলনে রাজনৈতিক পক্ষের অনুপ্রবেশও ঘটতে পারে। কিন্তু এসবের কোনোটিই শ্রমিকের মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করার যুক্তি হতে পারে না।
শ্রমিকের পরিচয় নির্ধারণ করবে কে?
পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বড় অংশই ঢাকার বাইরের জেলার মানুষ। জীবিকার সন্ধানে তাঁরা রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলে এসেছেন। তাঁদের জন্মস্থানকে বহিরাগত পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে দেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতাকেই অস্বীকার করা হয়।

একজন শ্রমিক কোথায় জন্মেছেন, সেটি তাঁর শ্রমিক পরিচয়ের নির্ধারক নয়। তিনি কোন কারখানায় কাজ করেন, তাঁর কর্মসংস্থান কী, শ্রমের বিনিময়ে কী পান এবং তাঁর অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে, এসবই হওয়া উচিত পরিচয় নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি।
অবশ্যই আন্দোলনের মধ্যে নাশকতা, সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের ব্যবহার করার ঘটনা ঘটলে তা তদন্ত ও বিচারের আওতায় আসতে হবে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
শ্রমিকের দাবি ন্যায্য কি না, তা নির্ধারণ হবে তাঁর মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও শ্রমের অধিকার দিয়ে। জন্মস্থান, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আন্দোলনের পেছনে কারা আছে- এসব প্রশ্ন তদন্তের বিষয় হতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের অধিকার অস্বীকারের অজুহাত নয়।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন। আন্দোলনের মধ্যে অপরাধ ঘটলে অপরাধীকে শনাক্ত করা রাষ্ট্রের কাজ। কিন্তু অপরাধের অভিযোগকে ব্যবহার করে শ্রমিকদের সম্মিলিত দাবিকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়া রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না।
ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া
বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৫৪ সালে কর্ণফুলী কাগজকল ও আদমজী পাটকলের সংঘর্ষের সময় শ্রমিকদের পরিচয়, জাতিগত বিভাজন ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সামনে এসেছিল। শ্রমিকদের বিরোধকে শুধু জাতিগত সংঘাত হিসেবে দেখলে কারখানার ক্ষমতা, বৈষম্য ও শ্রমিকদের ওপর কর্তৃত্বের প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে শ্রমিকদের অধিকার ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পায়। রাষ্ট্র শ্রমিককে উৎপাদনের অংশীদার হিসেবে দেখলেও শ্রমিকের স্বাধীন সংগঠন ও দরকষাকষির অধিকার বারবার সংকুচিত হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে বেসরকারীকরণ, শ্রমিক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিস্তার শ্রমিক সংগঠনগুলোকে আরও দুর্বল করেছে। আদমজী পাটকলের মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে শুধু চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটেনি, হারিয়ে গেছে শ্রমিকদের আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের একটি বড় অংশ।
পোশাকশিল্পে সেই সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো কখনোই যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। শ্রমিকদের একটি বড় অংশকে কর্মস্থলের আশপাশে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। মজুরি বাড়লেও বাড়িভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় তাঁদের জীবনকে অনিশ্চিত করে রাখে।

আন্দোলন হলেই উসকানির অভিযোগ
২০০৬ সালের পোশাকশ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০১০, ২০১৩, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের বিভিন্ন শ্রমিক অসন্তোষে একটি পরিচিত ভাষ্য বারবার ফিরে এসেছে। কখনো বিদেশি ষড়যন্ত্র, কখনো রাজনৈতিক উসকানি, কখনো বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ, আবার কখনো আন্দোলনকারীদের প্রকৃত শ্রমিক না হওয়ার অভিযোগ।
সরকার বদলেছে, মালিকানা বদলেছে, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব বদলেছে। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সন্দেহের দৃষ্টিভঙ্গি খুব বেশি বদলায়নি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। তাঁদের শ্রম দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। অথচ সেই শ্রমিকরাই যখন নিজেদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানান, তখন তাঁদের দাবির চেয়ে আন্দোলনের পেছনে কারা আছে, সেই প্রশ্ন বেশি গুরুত্ব পায়।
শ্রমিকের দাবি যাচাই করার আগে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রবণতা শ্রমিক অধিকারকে দুর্বল করে। এর ফলে প্রকৃত অসন্তোষের কারণগুলো সমাধান না হয়ে আরও গভীরে জমা হয়।
মজুরি বোর্ড আছে, কার্যকর দরকষাকষি কোথায়?
শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য আইন, মজুরি বোর্ড ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মজুরি পর্যালোচনার নির্ধারিত সময়, শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব, মালিকপক্ষের প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। শ্রমিকদের দাবি যখন প্রাতিষ্ঠানিক পথে সমাধান হয় না, তখন তাঁরা রাস্তায় নামেন।
এটি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নয় যে যেকোনো দাবির জন্য সড়ক অবরোধ কিংবা সহিংসতার আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করা যায় না যে কার্যকর আলোচনার পথ বন্ধ হলে আন্দোলনই অনেক শ্রমিকের শেষ অবলম্বন হয়ে ওঠে।
শ্রম আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সংগঠনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং শ্রমিক প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতা তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ের পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি থাকলেই শ্রমিকের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। যাঁরা কারখানায় কাজ করেন, যাঁরা মজুরি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন।
রাজনৈতিক শ্রমিক সংগঠন ও প্রতিনিধিত্বের সংকট
বাংলাদেশে শ্রমিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক সংগঠন প্রায়ই শিল্পাঞ্চলে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্ব ও কারখানার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যায়।
এতে শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে।
শ্রমিকের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সংগঠনের গণতান্ত্রিক কাঠামো, নির্বাচিত নেতৃত্ব, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে মালিকপক্ষ ও সরকারের প্রভাবমুক্ত শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারকে রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্তে আবদ্ধ করা হলে শ্রমিক আন্দোলনের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব দমন নয়, সমাধান
শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতা বা নাশকতা ঘটলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যেন নির্দিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে হয়, শ্রমিকদের সম্মিলিত দাবির বিরুদ্ধে নয়।
অজ্ঞাতপরিচয় বিপুলসংখ্যক মানুষকে মামলার আসামি করা, অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ না করা কিংবা গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে না আনা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।

রাষ্ট্রের কাছে ভিডিও, অডিও কিংবা অন্য কোনো তথ্য থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিন্তু অভিযোগের আড়ালে শ্রমিকদের ভয় দেখানো কিংবা তাঁদের ন্যায্য দাবি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
শ্রমিকের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও জরুরি। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করাই সরকারের দায়িত্ব।
শ্রমিককে সন্দেহ নয়, নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে
বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস একটি বিষয় স্পষ্ট করে: শ্রমিকের দাবি যখন উপেক্ষিত হয়, তখন অসন্তোষ ফিরে আসে। কখনো মজুরি নিয়ে, কখনো চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে, কখনো সংগঠনের অধিকার নিয়ে।
শ্রমিকের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এই অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়। বরং শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো সমাধান করতে হবে।
একজন শ্রমিকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, তাঁর জন্মস্থান অন্য জেলা হতে পারে, তিনি কোনো সংগঠনের সদস্যও হতে পারেন। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি একজন শ্রমজীবী নাগরিক, যাঁর অধিকার রাষ্ট্রের কাছে স্বীকৃত।

১৯৫৪ সালের আদমজী থেকে ২০২৬ সালের মিরপুর পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে প্রশ্নটি বারবার ফিরে এসেছে—কে প্রকৃত শ্রমিক, কে বহিরাগত?
সময়ের সঙ্গে প্রশ্নের ভাষা বদলেছে, কিন্তু সন্দেহের প্রবণতা থেকে গেছে। এখন প্রয়োজন সেই পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসা।
শ্রমিকের দাবি ন্যায্য কি না, তা নির্ধারণ হবে তাঁর মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও শ্রমের অধিকার দিয়ে। জন্মস্থান, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আন্দোলনের পেছনে কারা আছে- এসব প্রশ্ন তদন্তের বিষয় হতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের অধিকার অস্বীকারের অজুহাত নয়।

