আমরা অনেক সময়ই কক্সবাজারের সৈকতে ভেসে থাকা শৈবাল দেখে থাকি কিন্তু শৈবাল চাষ বা শৈবালের বাণিজ্যিক চাষ এই শব্দটি দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে এখনো প্রায় অজানা। কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়ায় এক নারী চাষি জানান, তিনি প্রতি মৌসুমে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার শৈবাল বিক্রি করেন।
এই বদলের ইতিহাসের শুরু ২০১৬ সালে,যখন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) গবেষকেরা কক্সবাজারের উপকূলে শৈবাল চাষের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন। তখন তাদের সাথে মরিয়ম বেগম ১০টি রশিতে শৈবাল চাষ শুরু করেন। আজ তিনি ৭৭ জনকে কাজ দিচ্ছেন এবং প্রায় ৫০০ জনকে চাষ শিখিয়েছেন। সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছরের ১৫ মে আবুল খায়ের গ্রুপ তাঁকে ‘এম-রাইজ হিরো’ সম্মাননা দেয়।চলুন আজ এই শৈবাল চাষের সম্ভাবনা ও এই চাষিদের নিয়ে জানা যাক।
চাষের ইতিহাস ও পদ্ধতি
২০১০ সালে সেন্ট মার্টিনে পরীক্ষামূলক চাষের পর ২০১৬ সালে বারি কক্সবাজারের উপকূলে চাষ শুরু করে। বারি সী উইড-১,বারি সী উইড-২ এই দুই ধরনের শৈবালই চাষ করা হয়।
গ্র্যাসিলারিয়া নামক একধরনের লাল শৈবাল যা অ্যাগার তৈরির প্রধান উপাদান। বারি সী উইড-২ যাকে সামুদ্রিক লেটুস পাতা বলা হয়। সাধারণত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ২ সে.মি. লম্বা বীজ নিয়ে রশিতে চাষ করা হয় যা পরবর্তীতে ৩০ দিনে ৩০০-৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে। রশিগুলো সাধারণত ৭-১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় যেখানে ২০ সে.মি. দূরে দূরে বীজ দেওয়া হয় যাতে শৈবালগুলো আকারে বড় হলে জোয়ার-ভাটাতে নষ্ট না হয়। প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১০ কেজি শৈবাল হয়ে থাকে। সাধারণত অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চাষ করা হয়।
মানুষ ও জীবিকা
২০২৫ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী,কক্সবাজারে প্রায় ৫০০ জন শৈবালচাষি রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জন নারী।আইজেক প্রকল্পের আওতায় ১২৩ জন নারী ও ৬০ জন পুরুষকে শৈবাল চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।মরিয়ম বেগম টানা ৯ বছর ধরে শৈবাল চাষ করছেন। তার পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস এটি।

গত বছর এক টনের কম শৈবাল বিক্রি করে তিনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা।চলতি মৌসুমে তার কাছে দেড় টন শৈবাল ছিল। বড় পাইকারের কাছে কেজি ১২০ টাকা, ছোট পাইকারের কাছে ১৫০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। আর এক নারী চাষি জুলিয়া ও তার শাশুড়ি হাজেরা এবার কেজিপ্রতি ১০০ টাকা দরে শৈবাল বিক্রি করেছেন।
২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে আনোয়ারা বেগমের কথা উঠে আসে। আগে তিনি সৈকত থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। পরে শৈবাল সংগ্রহ ও চাষ শুরু করেন। বর্তমানে প্রতি দফায় শৈবাল বিক্রি করে তার আয় হয় প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। তিনি আরও বলেন,আগে শামুক সংগ্রহ করে তার আয় ছিল অনিশ্চিত, এখন মৌসুমে শৈবাল চাষ থেকে তুলনামূলক নিয়মিত আয় হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের বিশ্লেষণেও শৈবাল চাষকে উপকূলীয় পরিবারগুলোর পরিপূরক আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালে Heliyon সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের শৈবাল চাষবিষয়ক এক গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ চাষি দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থাকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ৭১ শতাংশ বলেছেন, পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা নেই। এ ছাড়া ৬৮ শতাংশ মূল্য সংযোজিত পণ্যের অভাব এবং ৬৫ শতাংশ উৎপাদিত শৈবালের কম দামকে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৪৫ শতাংশের মতে, প্রবল ঢেউয়ে শৈবালের খামার ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ,সমুদ্রের পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল এই চাষে প্রাকৃতিক ঝুঁকিও সরাসরি কৃষকের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শ্রীলঙ্কার ইউনিভার্সিটি অব রুহুনা (University of Ruhuna)-এর ২০২৬ সালের সম্মেলন কার্যবিবরণীতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক শৈবাল চাষ ও রপ্তানির সক্ষমতা নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটিতে কক্সবাজার ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৭৫ জন শৈবাল উৎপাদকের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, রপ্তানি প্রস্তুতির সূচকে উৎপাদকদের গড় স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ১৯ দশমিক ০২। জরিপে অংশ নেওয়া ৬১ দশমিক ১ শতাংশ উৎপাদক ছিলেন রপ্তানি প্রস্তুতির সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এমনকি কোনো উৎপাদকই সর্বোচ্চ দুটি প্রস্তুতি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
শৈবাল চাষ উপকূলের নারীদের জন্য শুধু বাড়তি আয়ের সুযোগ নয়, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ারও একটি পথ তৈরি করতে পারে। ঘরের কাজের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এই চাষে যুক্ত হয়ে নারীরা নিজেরাই আয় করতে পারেন। মরিয়ম বেগমের মতো উদ্যোক্তারা অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেখাচ্ছেন, একজন নারীর উদ্যোগ কীভাবে আরও অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা গেলে শৈবাল চাষে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। এতে উপকূলীয় পরিবারগুলোর আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নারীদের অবদান আরও দৃশ্যমান হবে।

