ইতিহাস, আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার পথে ইরানের দীর্ঘ যাত্রা, আর বাংলাদেশের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার আয়না…
পরাশক্তির সামনে মাথা নত না করার ইতিহাস
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি জাতি যদি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও ধৈর্য, একাগ্রতা ও নিষ্ঠা ধরে রাখতে পারে, তাহলে সে কোথায় পৌঁছাতে পারে?
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এর একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ, সামরিক হুমকি ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা সহ্য করেও দেশটি বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে। সামরিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক প্রতিকূলতার মুখেও তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও জাতীয় কৌশল সহজে ভেঙে পড়েনি।
এই অবস্থানকে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে আছে দীর্ঘ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, জাতীয়তাবোধ, আত্মনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা এবং বহু দশকে গড়ে ওঠা কৌশলগত মানসিকতা।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য: আত্মপরিচয়ের শক্তি
ইরান শুধু একটি আধুনিক রাষ্ট্র নয়, প্রাচীন পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকার বহনকারী একটি জাতি। হাজার বছরের সাহিত্য, দর্শন, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ইরানিদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। এই উত্তরাধিকার তাদের আত্মপরিচয়কে এমন গভীরতা দিয়েছে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তন বা আন্তর্জাতিক চাপেও মুছে যায়নি। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে রাষ্ট্রব্যবস্থা আমূল বদলালেও ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা অটুট রয়েছে।
একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ: রাষ্ট্রীয় আদর্শ আর সব নাগরিকের রাজনৈতিক মতাদর্শ এক নয়। ইরানের সমাজেও মতভেদ, অসন্তোষ, সংস্কারের দাবি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে। তবু রাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীনতার প্রশ্নে মানুষের মধ্যে শক্তিশালী আবেগ কাজ করতে পারে। একটি জাতির প্রকৃত শক্তি সেখানেই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য তৈরি হয়।
নিষেধাজ্ঞা থেকে আত্মনির্ভরতার শিক্ষা
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, কর্মসংস্থানের সমস্যা ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি সেখানকার বাস্তবতা। তাই ইরানের পথচলাকে একতরফা সাফল্যের গল্প বলা যায় না।
তবু এই প্রতিকূলতার মধ্যেই দেশটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, সামরিক গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় নিজস্ব সক্ষমতা গড়ার চেষ্টা করেছে। নিষেধাজ্ঞা বাধা তৈরি করেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থা গড়ার তাগিদও দিয়েছে।
এখান থেকে প্রধান শিক্ষা আত্মনির্ভরতা। যে দেশ সবকিছুর জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল, আন্তর্জাতিক সংকটে তার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা, শিল্প, কৃষি ও উৎপাদনে নিজস্ব সক্ষমতা থাকলে প্রতিকূলতাতেও টিকে থাকার শক্তি জন্মায়। ইরানের পথ নিখুঁত নয়, সমস্যাও কম নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ধরে রাখার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের ময়দান থেকে কূটনীতির টেবিলে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুধু দুই দেশের সামরিক শক্তির লড়াই নয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক আধিপত্য ও কূটনৈতিক সক্ষমতারও পরীক্ষা।
২০২৬ সালের ১৮ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায়। এর লক্ষ্য ছিল সামরিক উত্তেজনা প্রশমন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং বৃহত্তর বিরোধ নিষ্পত্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। দীর্ঘ সংঘাত ও চাপের পরও আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান ধরে রাখা ইরানের জন্য একটি কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে একটি স্মারক মানেই সব বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, পারস্পরিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ আলোচনার ওপর। তবু শিক্ষাটি স্পষ্ট: সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কূটনৈতিক সক্ষমতা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিরোধ গড়ার পাশাপাশি তাকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দেওয়াও একটি জাতির বড় সক্ষমতা।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় বিজয় ও রিপাবলিকানদের পরাজয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ দলের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং নতুন যুদ্ধের প্রতি জনগণের অসন্তোষ ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এটিকে যুদ্ধবিরোধী জনমতের প্রতিফলন বলে ব্যাখ্যা করেছে।
এখানে ইরানের একটি কৌশলগত দিক আছে: আন্তর্জাতিক সংঘাত কখনো কখনো প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে। তবে ফলাফলকে শুধু ইরানের বিজয় বলা বাস্তবসম্মত হবে না। মার্কিন জনগণের অর্থনৈতিক অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং গণতন্ত্র ও প্রশাসন নিয়ে নানা প্রশ্নও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ইরান যুদ্ধ সেই বৃহত্তর অসন্তোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্ব জনমত ও ইরানের নতুন ভাবমূর্তি
একসময় পশ্চিমা গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বয়ানে ইরানকে প্রধানত নিরাপত্তা সংকট, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক সংঘাতের আলোকে দেখা হতো। সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও কূটনৈতিক ঘটনা সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিভিন্ন দেশে ইরানের প্রতি সহানুভূতি, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা দৃশ্যমান হয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যু ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জনমতকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে।
তবে সমর্থন বাড়ার অর্থ এই নয় যে সবাই ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতির সমর্থক। অনেকে সমর্থন জানাচ্ছেন মূলত যুদ্ধবিরোধিতা, আন্তর্জাতিক আইন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং পরাশক্তির একতরফা আধিপত্যের বিরোধিতার কারণে। একটি জাতির ভাবমূর্তি শুধু সামরিক শক্তিতে নয়, তার অবস্থান, আচরণ, কূটনীতি ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্য দিয়েও গড়ে ওঠে।
ইরানের কাছে বাংলাদেশের শিক্ষণীয় কী?

২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও আমাদের জাতীয় জীবনের বড় অংশ জুড়ে আছে ধর্মীয় বিভাজন, দলীয় সংঘাত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্ব। জাতীয় লক্ষ্য ঠিক করার চেয়ে আমরা অনেক সময় বেশি ব্যস্ত থাকি কে কোন দলের, কোন মতের, কোন ধর্মীয় পরিচয়ের, সেই প্রশ্নে।
আমাদের ইতিহাস আছে, ভাষার জন্য আত্মত্যাগ আছে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব আছে। প্রশ্ন হলো, তা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারছি? শুধু অতীতের গৌরবে জাতি গড়ে ওঠে না। দরকার সুস্পষ্ট লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় ঐক্য।
ইরানের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন তোলে:
- আমরা কি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারি?
- আমরা কি ধর্মীয় পরিচয়কে বিভাজনের অস্ত্র না বানিয়ে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সম্প্রীতির ভিত্তি হিসেবে দেখতে পারি?
- আমরা কি শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারি?
- আমরা কি একটি জাতীয় লক্ষ্য ঠিক করে কয়েক দশক ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে তা অনুসরণ করতে পারি?
একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও ধৈর্য: জাতীয় উন্নয়নের মূল শক্তি
কোনো জাতি রাতারাতি শক্তিশালী হয় না। উন্নয়ন তাৎক্ষণিক আবেগের ফল নয়; এটি দীর্ঘ পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। ইরানের অভিজ্ঞতা অন্তত এটুকু দেখায় যে প্রতিকূলতার মধ্যেও জাতীয় লক্ষ্য ধরে রাখলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
তবে ধৈর্য মানে অন্যায় সহ্য করা নয়, একাগ্রতা মানে অন্ধ আনুগত্য নয়, আর নিষ্ঠা মানে ভুল নীতিতে আটকে থাকা নয়। প্রকৃত জাতীয় শক্তি আসে আত্মসমালোচনা, ভুল সংশোধন, জনগণের অধিকার রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নত রাষ্ট্র গড়ার মধ্য দিয়ে।
ইরানের কাছ থেকে শেখার বিষয় কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্ধ অনুকরণ নয়। শেখার বিষয় হলো ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রতি সচেতনতা, জাতীয় স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রতিকূলতার মধ্যে সক্ষমতা গড়া এবং কূটনৈতিকভাবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার মানসিকতা।
আমরা কোথায় যেতে চাই?
জাতি যখন লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার থাকে, প্রতিকূলতা তাকে থামাতে পারে না; বরং অনেক সময় সেই প্রতিকূলতাই তাকে নতুনভাবে গড়ে ওঠার তাগিদ দেয়। ইরান ইতিহাস, ঐতিহ্য, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় কৌশলকে সামনে রেখে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। তার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, দুটিই আমাদের বিশ্লেষণ করা উচিত।
বাংলাদেশেরও অসাধারণ সম্ভাবনা আছে। আমাদের মানুষ পরিশ্রমী, তরুণেরা মেধাবী, ইতিহাস সংগ্রামের, সংস্কৃতি সমৃদ্ধ। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তব শক্তিতে রূপ দিতে হলে ক্ষুদ্র বিভাজন, অন্ধ দলীয় আনুগত্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও তাৎক্ষণিক আবেগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দরকার একটি জাতীয় লক্ষ্য, একটি উন্নয়ন দর্শন এবং তা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ঠা।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যে জাতি নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন, ধৈর্য ধরে সক্ষমতা গড়ে তোলে এবং আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যতের প্রশ্নে একাগ্র থাকে, তাকে অবহেলা করার সুযোগ কোনো পরাশক্তিরই থাকে না।
সালাম ইরানের জনগণের প্রতিরোধ, আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতা গড়ার প্রচেষ্টাকে। আর বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় শিক্ষা: বিভাজন নয়, জাতীয় লক্ষ্য; অন্ধ আবেগ নয়, দূরদর্শিতা; আত্মতুষ্টি নয়, আত্মনির্ভরতা।

