সাত বছরের দাম্পত্য জীবন। একসঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা এবং একটি সংসার গড়ে তোলার দীর্ঘ পথচলা। অথচ সন্তান না হওয়ার কারণে সেই সম্পর্কের অবসান ঘটেছে। সংসার টিকিয়ে রাখতে স্বামীর পা ধরে কান্নাকাটি করেছেন স্ত্রী। কিন্তু তাঁর আকুতি-মিনতিতেও স্বামীর সিদ্ধান্ত বদলায়নি। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন তিনি। প্রশ্ন হলো, বিবাহের অর্থ কি কেবল সন্তান জন্ম দেওয়া? একজন নারীর মাতৃত্বের সক্ষমতাই কি তাঁর মর্যাদা নির্ধারণ করবে? সন্তান না হলে কি সাত বছরের সম্পর্ক, স্মৃতি ও ভালোবাসার কোনো মূল্য থাকে না?
বরিশালের হিজলা উপজেলার ইতি আক্তারের বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা এসব প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রকাশিত ভিডিও ও বরিশাল প্রতিবেদক রাহাদ সুমনের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, সন্তান না হওয়ার কারণ দেখিয়ে সাত বছর সংসার করার পর স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন তাঁর স্বামী। স্থানীয় সালিশে সংসার টিকিয়ে রাখতে স্বামীর পা ধরে কান্নাকাটি করেন ইতি। স্বামীর দাবি, চিকিৎসকদের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, তাঁর স্ত্রী কখনো মা হতে পারবেন না। অবশেষে শুধুমাত্র সন্তান না হওয়ার অজুহাতে স্ত্রীকে ডির্ভোস দিয়েছেন তার স্বামী। ফলে ইতি আক্তারের সাত বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটেছে।

ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের বিচ্ছেদ নয়; এটি নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, বন্ধ্যাত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা, দাম্পত্য সম্পর্কে সহমর্মিতার অভাব এবং নারীর আইনগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সন্তান লাভের বিষয়েও কোরআনে মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। সুরা আশ-শুরার ৪৯ ও ৫০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন, কাউকে উভয়ই দেন এবং কাউকে সন্তানহীন রাখেন। অর্থাৎ সন্তান না হওয়াকে কোনো নারীর অপরাধ কিংবা নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সন্তান না হওয়ার দায় কেন শুধু নারীর?
আমাদের সমাজে সন্তান না হলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম অভিযোগ ওঠে স্ত্রীর বিরুদ্ধে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় নারীকে। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সন্তান ধারণে অসুবিধার কারণ নারী, পুরুষ, উভয় পক্ষ কিংবা কখনো শনাক্ত করা যায় না এমন কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সী প্রায় প্রতি ছয়জন মানুষের একজন জীবনের কোনো পর্যায়ে বন্ধ্যাত্বের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। নিয়মিত অরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও ১২ মাস বা তার বেশি সময় গর্ভধারণ না হলে তাকে বন্ধ্যাত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বন্ধ্যাত্ব শনাক্ত হওয়া আর জীবনে কখনো সন্তান ধারণ করা সম্ভব হবে না- এই দুটি বিষয় এক নয়।
এখানে প্রশ্ন হলো, সন্তান না হওয়ার জন্য একজন নারীকে দায়ী করার আগে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়েছে কি? শুধু স্ত্রীর চিকিৎসা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁকে দায়ী করা কতটা বৈজ্ঞানিক? এমনকি চিকিৎসায় কোনো নারীর সন্তান ধারণের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম বলে জানা গেলেও তাঁর মানবিক মর্যাদা কি তাতে কমে যায়?
একজন নারী মা হতে না পারলে তিনি কি স্ত্রী হিসেবে ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য সম্পর্ক ও মানবিক মর্যাদা
ইসলামে বিবাহ কেবল সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থা নয়; এটি পারস্পরিক শান্তি, ভালোবাসা, দয়া ও দায়িত্ববোধের সম্পর্ক। পবিত্র কোরআনের সুরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার কথা বলা হয়েছে। সুরা আন-নিসার ১৯ নম্বর আয়াতে স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ রয়েছে।
সন্তান লাভের বিষয়েও কোরআনে মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। সুরা আশ-শুরার ৪৯ ও ৫০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন, কাউকে উভয়ই দেন এবং কাউকে সন্তানহীন রাখেন। অর্থাৎ সন্তান না হওয়াকে কোনো নারীর অপরাধ কিংবা নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ইসলামে নির্দিষ্ট শর্তে তালাকের অনুমতি থাকলেও তা কাউকে অপমান বা অধিকারবঞ্চিত করার অবাধ অনুমতি দেওয়া হয়নি। সুরা আল-বাকারার ২২৯ নম্বর আয়াতে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে সদাচরণ এবং বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়ার নীতি রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একজন স্ত্রীকে সামাজিক সালিশে সবার সামনে স্বামীর পা ধরে কান্নাকাটি করতে হওয়া ইসলামের দয়া, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষার সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ?

বাংলাদেশের আইনে তালাক ও নারীর অধিকার
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী, স্বামী তালাক দিলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে এবং স্ত্রীর কাছেও তার অনুলিপি দিতে হবে। নোটিশ পাওয়ার পর পুনর্মিলনের চেষ্টা করার বিধান রয়েছে। সাধারণ নিয়মে চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন- প্রজননস্বাস্থ্যসেবায় বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দম্পতিরা কতটা সহজে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পাচ্ছেন? আর বিবাহবিচ্ছেদের কারণে অসহায় হয়ে পড়া কোনো নারী তাঁর অধিকার রক্ষার জন্য কোথায় যাবেন?
বরিশালের আলোচিত ঘটনায় তালাকের আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি? স্ত্রীকে লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি? তাঁর দেনমোহর, প্রযোজ্য ভরণপোষণ ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে কি? প্রকাশিত বিবরণে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
গ্রাম্য সালিশের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে। সালিশ কি দুজন মানুষের বক্তব্য শোনা, সমঝোতার চেষ্টা এবং ন্যায্য অধিকার রক্ষার জায়গা, নাকি একজন অসহায় নারীকে সবার সামনে অপমানিত হতে দেখার আয়োজন? রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, বিবাহবিচ্ছেদের কারণে কোনো নারী যেন তাঁর আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা।

সমাজের মানসিকতা বদলাবে কবে?
আমাদের সমাজে বিয়ের পর সন্তান না হলে অনেক সময় নারীকে এমনভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করা হয়, যেন সন্তান জন্ম দেওয়াই তাঁর জীবনের একমাত্র সার্থকতা। আত্মীয়স্বজনের কটূক্তি, পরিবারের চাপ কিংবা দ্বিতীয় বিয়ের আলোচনা ব্যক্তিগত সংকটকে সামাজিক অপমানে পরিণত করতে পারে।
অথচ একজন নারী মা হতে না পারলেও তাঁর মানুষ হিসেবে মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। একইভাবে সন্তান ধারণে অক্ষম কোনো পুরুষও অসম্মানের পাত্র নন। প্রজননক্ষমতা মানুষের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না।
ইতি আক্তারের কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াও উদ্বেগজনক। একজন নারীর দাম্পত্য জীবনের ব্যক্তিগত সংকট জনসমক্ষে প্রকাশ করা তাঁর গোপনীয়তা ও মর্যাদার প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁর প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর পরিবর্তে সেই অসহায় মুহূর্তকে প্রচারের উপকরণ বানানো কতটা মানবিক?
চিকিৎসা, সহমর্মিতা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
বন্ধ্যাত্ব কোনো অপরাধ কিংবা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যা। এর কারণ শনাক্ত করতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের চিকিৎসা পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে সন্তান ধারণ সম্ভব হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসার পরও সফলতা আসে না। তাই চিকিৎসাগতভাবে নিশ্চিত না হয়ে কাউকে সন্তান ধারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম ঘোষণা করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

বাংলাদেশে বন্ধ্যাত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, দম্পতিদের চিকিৎসা ও মানসিক পরামর্শের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সেবা সহজলভ্য করা জরুরি। পাশাপাশি বিচ্ছেদের মুখোমুখি নারীদের জন্য আইনগত সহায়তা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন- প্রজননস্বাস্থ্যসেবায় বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দম্পতিরা কতটা সহজে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পাচ্ছেন? আর বিবাহবিচ্ছেদের কারণে অসহায় হয়ে পড়া কোনো নারী তাঁর অধিকার রক্ষার জন্য কোথায় যাবেন?
সন্তান না হলে কি ভালোবাসারও মৃত্যু হয়?
সন্তান একটি পরিবারের বড় আকাঙ্ক্ষা হতে পারে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে কি সাত বছরের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও দায়িত্বের কোনো মূল্য থাকে না? যে মানুষটি সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন, সন্তান ধারণে তাঁর অক্ষমতার আশঙ্কা দেখা দিলে তাঁর প্রতি সহমর্মিতার জায়গা কোথায়?
বিবাহবিচ্ছেদ একজন মানুষের আইনগত অধিকার হতে পারে। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের সময় অন্যজনের মর্যাদা, সম্মান ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার দায়িত্বও রয়েছে।
ইতি আক্তারের ঘটনা তাই শুধু একটি সংসার ভাঙার গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন। আমরা কি একজন নারীকে শুধু মা হওয়ার সক্ষমতা দিয়ে বিচার করব, নাকি মানুষ হিসেবে তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেব?
সন্তান একটি সংসারের আনন্দ হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের শর্ত হতে পারে না। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সবচেয়ে অসহায় মানুষের প্রতি আচরণেই প্রকাশ পায়।
- এফ. আর. ইমরান, সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক

