আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদনের ২৫০ বছর পূর্তি পালিত হবে। একই সময়ে আরেকটি বিশ্বজনীন মাইলফলক সামনে আসছে। ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত অ্যাডাম স্মিথের বই দ্য ওয়েলথ অব নেশন্স ছুঁতে যাচ্ছে ২৫০ বছর। আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি এই গ্রন্থের অন্তর্দৃষ্টিগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে সেগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
অ্যাডাম স্মিথ মূলত দুটি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অর্থনীতির রূপরেখা এঁকেছিলেন। প্রথমটি হলো বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’। অর্থাৎ বাজার স্বাভাবিক নিয়মে সম্পদকে দক্ষভাবে বণ্টন করে। তবে এর জন্য শর্ত থাকে—স্থিতিশীল মুদ্রা, আস্থা ও নৈতিকতার পরিবেশ এবং সুরক্ষিত সম্পত্তির অধিকার। কিন্তু বাহ্যিকতা, তথ্যগত ঘাটতি ও অসমতা এই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে।
তার দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো শ্রম বিভাজন বা বিশেষায়ন। বিশেষায়িত কাজ উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং নতুন জ্ঞান, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করে। তবে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্মিথ বলেছিলেন, বাজারের পরিধি যত বড় হবে, বিশেষায়নের সুযোগ তত বাড়বে। এজন্য পরিবহন ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতি বিশেষায়নকে বিস্তৃত করেছে।
তবে বিশেষায়নের ঝুঁকিও কম নয়। কোনো দক্ষতা বা শিল্প অপ্রচলিত হয়ে পড়লে পুরো অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে পারে। ১৯ ও ২০ শতকে এসব ঝুঁকি কমাতে একচেটিয়া বিরোধী আইন, সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি নীতি গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশেষায়ন জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক মাত্রা পায়।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুক্ত বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক কাঠামোর পতন এবং প্রযুক্তির উন্নতি বৈশ্বিক বিশেষায়নকে ত্বরান্বিত করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিদেশি বাজার ও প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। কিন্তু এতে একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভৌগোলিকভাবে সরতে থাকে, অন্যদিকে কাঠামোগত ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
শুরুতে এসব ঝুঁকি তেমন গুরুত্ব পায়নি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জলবায়ু সংকট, কোভিড-১৯, ইউক্রেন ও গাজার যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন ধাক্কা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ও তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বৈশ্বিক বিশেষায়নের ধারা আংশিকভাবে উল্টে দেয়। অনেক দেশ এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করছে।
ফলে বিশেষায়ন পুরোপুরি বিলীন না হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর প্রভাব সীমিত হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে, প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে ছোট অর্থনীতি ও কম মাথাপিছু আয়ের দেশগুলো, যাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা সীমিত এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার অনিশ্চিত।
এদিকে নতুন এক চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে। জেনারেটিভ এআই এখন খুব কম খরচে নানা দক্ষতা মানুষের নাগালে এনে দিচ্ছে। এতে বিশেষায়িত জ্ঞান সহজলভ্য হয়ে পড়ছে। ফলে যেসব দক্ষতা সহজে বর্ণনা বা নথিভুক্ত করা যায়, তার মূল্য কমতে পারে। বরং জটিল ও স্থানান্তর-অযোগ্য জ্ঞানের গুরুত্ব বাড়বে।
২৫০ বছর আগে যে শ্রম বিভাজনের ধারণা স্মিথ দিয়েছিলেন, তা আজও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতা পাল্টেছে। বৈশ্বিক আন্তঃনির্ভরতার ঝুঁকি একদিকে বিশেষায়নকে সীমিত করছে, অন্যদিকে এআই মানব পুঁজির মানচিত্রকেই বদলে দিচ্ছে। সামনে প্রশ্ন হচ্ছে—ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে কোন জ্ঞান ও দক্ষতা সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠবে?
মাইকেল স্পেন্স: অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্নাতক স্কুল অব বিজনেসের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সাবেক ডিন। ‘পার্মাক্রাইসিস: আ প্ল্যান টু ফিক্স আ ফ্র্যাকচার্ড ওয়ার্ল্ড’ (সাইমন অ্যান্ড শুস্টার, ২০২৩) বইটির সহলেখক (মোহাম্মদ এ এল-এরিয়ান, গর্ডন ব্রাউন এবং রিড লিডোসহ)

