দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে নিত্যনতুন মাত্রায়। এসব সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘ডিজিটাল ভায়োলেন্স’। ‘ডিজিটাল ভায়োলেন্স’ হলো তুলনামূলক নতুন শব্দ। এটি অনলাইন সহিংসতা, প্রযুক্তির সাহায্যে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বা সাইবার সহিংসতা ইত্যাদি বলেও পরিচিত। বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যার দেশ, এখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য—উভয়ই বেশি। তাই এখানে ঝুঁকিও বেশি।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নানা কায়দায় অপরাধীরা ডিজিটাল সহিংসতা ঘটিয়ে থাকে। অনলাইনে সহিংসতার মাত্রা ও ব্যাপ্তি অনেক হলেও আন্তর্জাতিকভাবে এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা যায়নি। ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বলছে, কোনো কোনো দেশে জেন্ডারভিত্তিক ডিজিটাল ভায়োলেন্সের পরিমাণ ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত।
বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রকাশিত ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন জরিপ থেকে জানা যায়, ৮ দশমিক ২ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময় এবং ৫ শতাংশ নারী গত এক বছরে ডিজিটাল ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছেন। বয়সভেদে এই হারে বেশ পার্থক্যও আছে। দেশে ডিজিটাল সহিংসতার বেশি শিকার হচ্ছেন ২০-২৪ এবং ১৫-১৯ বছর বয়সী নারীরা। সামাজিক ও বৈবাহিক অবস্থানভেদেও এ সহিংসতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। বিত্তশালী নারীরা অনলাইন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। এদিকে যাঁদের স্বামী দূরে অবস্থান করেন, এমন স্ত্রীদের প্রতি সহিংসতার হারও বেশি। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারীরাও তুলনামূলক বেশি মাত্রায় অনলাইন সহিংসতার শিকার হন।
যে কারণগুলোর জন্য নারীর প্রতি ডিজিটাল সহিংসতা হয়, সেগুলো অফলাইনে সংঘটিত সহিংসতার কারণের চেয়ে তেমন আলাদা কিছু নয়। অফলাইনের মতোই সমাজে বিরাজমান অমর্যাদাকর দৃষ্টিভঙ্গি, সাংস্কৃতিক সীমা ও নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ।
তথাকথিত ‘পছন্দনীয়’ কায়দায় কোনো নারীর অনলাইন উপস্থাপন বা কাজকর্ম না হলে, তার ওপর নেমে আসে নানা রকম হয়রানি ও সহিংসতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো হয়রানিমূলক পোস্টের বিপরীতে মানুষের প্রতিক্রিয়া, মন্তব্যই আমাদের বলে দেয়, কারও প্রতি সহিংসতামূলক আচরণকে তারা কীভাবে স্বাভাবিকীকরণ করে। ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, উঠতি বয়সীরা এই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার কারণে একসময় সহিংসতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন।
কানাডীয়-আমেরিকান মনোবিদ আলবার্ট বান্দুরা তাঁর সামাজিক শিক্ষা তত্ত্বে (১৯৭৭) বলেছিলেন, শিশুরা অন্যকে দেখে সামাজিক আচরণ শেখে। যখন সে সহিংসতা দেখে, নারীকে ভুক্তভোগী হতে দেখে এবং যথাযথ প্রতিকার বা প্রতিরোধে দেখে না, তখন তারা সহিংসতাকে স্বাভাবিক ঘটনা অথবা একটি সামাজিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে নারীরা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা রকম বৈষম্য ও অসমতার শিকার হন। এ দেশে আইন, অর্থনীতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, জনপরিসর ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী যে বৈষম্যের শিকার, তা আদতে নারীর প্রতি সহিংসতাকে একটা ব্যবস্থার অংশ বানিয়ে ফেলে, যা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সহিংসতার সংস্কৃতির ব্যাপ্তি ঘরে, বাইরে, অফলাইনে বা অনলাইনে—সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে।
অনলাইনে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা। ২০২৪ সালের সাইবার সুরক্ষা আইনের ডিজিটাল জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা করার সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। বাংলাদেশ সহিংসতা রিপোর্টিংয়ের হার খুব কম।
ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে নিবিড় সঙ্গী দ্বারা সহিংসতার ঘটনায় মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী কাউকে ঘটনা সম্পর্কে জানান এবং মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করেন। সঙ্গী ছাড়া অন্য কারও দ্বারা ঘটিত সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের হার ১৩ দশমিক ২। এই হার বিবেচনায় বোঝা যায়, শুধু শুধু আইনি নীতিমালা থাকা যথেষ্ট নয়। সহিংসতা রিপোর্ট করার প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করতে হবে। আর ভয়ভীতি কমানোর জন্য সহায়তা প্রদান ব্যবস্থা ও সুরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সব স্তরের মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রান্তিক, উঠতি বয়সী, একা থাকা ও অনলাইনভিত্তিক কাজ বা ব্যবসা করা নারীরা অনলাইন সহিংসতার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব অবস্থান ও অবস্থা বিবেচনা করে সচেতনতা, সহিংসতার ক্ষেত্রে করণীয় ও অন্যান্য সহায়তাব্যবস্থা সম্পর্কে নারীদের সচেতন করতে হবে। যারা অনলাইন সহিংসতা করে, তাদের চিহ্নিত করে প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে নিবৃতকরণ ও সচেতন করা প্রয়োজন। অনলাইনে যেসব প্ল্যাটফর্মে নারী হয়রানির এর শিকার হচ্ছেন, সেই প্ল্যাটফর্মেই অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে নারীকে হেয় বা হয়রানি করার এবং সহিংসতাকে স্বভাবিকীকরণের যে বিরাজমান মানসিকতা রয়েছে, তা ভেঙে ফেলার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।
- সানজীদা আখতার: অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: প্রথম আলো

