বর্তমান বাংলাদেশে কি সত্যিকারের বিশ্বমানের একজন কবি বা সাহিত্যিক আছে? সত্যিকারের বিশ্বমানের একজন শিক্ষক বা গবেষক আছে? দেশে কি এখন বড় মাপের কার্টুনিস্ট আছে? টিভি পারসোনালিটি আছে?
আমি যখন স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন দেশে অনেক প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের নাম শুনতাম, দেখতাম এবং তাদের বই পড়তাম। সেই সময় দেশে একই সঙ্গে আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস, শামসুর রহমান, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, হাসান আজিজুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদসহ অনেকেই জীবিত ছিলেন।
সেই সংখ্যা কমতে কমতে হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত ঠেকেছিল। এরপর উনি মারা যাওয়ার পর থেকে দেশ সাহিত্যিক শূন্যতায় ভুগছে। আমি যখন স্কুল-কলেজে পড়ি তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষকের নাম জানতাম যারা সমাজকে আলো দেখাতে পারতেন, সরকারের চোখে চোখ রেখে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারতেন। এই অভাব অনেকটা শরীরের রক্ত শূন্যতার মতো।
এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষক নেই। আর বিশ্বমানের গবেষকের কথা বললে সেটা তখনও ছিল না, এখনও নেই। একটু খুলে বলি। কলকাতা থেকে প্রতি বছর ১০ থেকে ১২টি Nature আর্টিকেল হয়।
পদার্থবিজ্ঞানের সেরা জার্নাল হলো Physical Review Letters। কলকাতা থেকে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০টি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও বাংলাদেশের কেউ দেশে বসে একটা Physical Review আর্টিকেল করেছে বলে শুনিনি। পদার্থবিজ্ঞানের একজন ভালো গবেষক মানে তাদের বেশির ভাগ আর্টিকেল প্রকাশিত হবে APS, AIP ও IOP থেকে প্রকাশিত জার্নালে।
আমাদের বাংলাদেশের অধিকাংশ গবেষক আর্টিকেল প্রকাশ করে Elsevier থেকে। Elsevier ভালো, তবে এই প্রকাশক হলো কর্পোরেট কোম্পানি যার প্রফিট মার্জিন গুগলের প্রফিটের কাছাকাছি। আর APS, AIP ও IOP হলো সোসাইটি যারা প্রফিটমঙ্গার না। এখানেই পার্থক্য।
এই যে দেশে সত্যিকারের কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক ও গবেষকের খরা চলছে, তার প্রতিফলনও সমাজে দেখছি। রাজনীতির ভাষা শুনলে টের পাই, রাস্তাঘাটে হাঁটলে টের পাই, নদীনালার দিকে তাকালে টের পাই, অফিস-আদালতে গেলে টের পাই। কবে আমাদের নীতিনির্ধারকরা এইসব সমস্যাকে বুঝতে পারবে?
- লেখক—ড. কামরুল হাসান মামুন, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

