একটি দেশের অর্থনীতি অনেকটা নদীর মতো। দূর থেকে দেখলে স্রোত মসৃণ মনে হয়, জল চকচক করছে কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, কোথাও ভাঙন, কোথাও পলি জমে পথে বাধা তৈরি করেছে। নদীর মতোই, অর্থনীতির ধারাও এককথায় সরল নয়। কখনও প্রবাহটা রুদ্ধ হয়, কখনও আবার নতুন স্রোত তৈরি হয়। মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই বাধাগুলো চিহ্নিত করে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে নদী আবার নিজের স্বাভাবিক গতি পায়।
ঋণ, বৈষম্য ও আস্থাহীনতার ত্রিভুজে বাংলাদেশ, ২০২৬ কি অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে পারবে:
একটি দেশের অর্থনীতি অনেকটা নদীর মতো। দূর থেকে দেখলে স্রোতটা মসৃণ মনে হয়, জল চিকচিক করে। কিন্তু কাছাকাছি গেলে বোঝা যায়, কোথাও ভাঙন, আর কোথাও পলি জমে পথ আটকে গেছে। কোথাও আবার নিচে ঘূর্ণি তৈরি হয়ে আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যার উপরিভাগে স্থিতির আভাস, অথচ ভেতরে জমে আছে অস্বস্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ও কলামগুলো একসঙ্গে পড়লে এ অস্বস্তির মানচিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬-এ বণিক বার্তার সরকারি ঋণবিষয়ক বিশ্লেষণ জানাচ্ছে ঋণের ভারের কথা। একই দিন প্রথম আলোতে আলতাফ পারভেজ লিখছেন বৈষম্যের গভীর ক্ষতের কথা। আর এ দুইয়ের মাঝখানে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংক খাত। যেন নদীর সেই সেতু, যার ওপর দিয়ে পুরো অর্থনীতির যাতায়াত, অথচ যার পিলারেই ফাটল ধরেছে।
একজন ব্যাংকার হিসেবে দিনের পর দিন সংখ্যার ভেতর বসবাস করলেও আমি জানি অর্থনীতি শুধু সংখ্যা নয়। এটি মানুষের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর ক্ষীণ আশার গল্প। ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা তাই খুব সাধারণ, আবার খুব কঠিন। এ স্রোত কি নতুন দিকে মোড় নেবে, নাকি একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকবে?
ঋণের স্রোত, উন্নয়নের জল না ভবিষ্যতের প্লাবন:
ঋণ একসময় বাংলাদেশের জন্য ছিল গতির জ্বালানি। অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে, যোগাযোগ সহজ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন ঋণ আর পরিকল্পনার অংশ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে স্বাভাবিক অভ্যাস। যেন প্রতি বাজেটেই ঘাটতি মানে নতুন করে ধার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৩ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। ফলে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এ সংখ্যাটা কেবল বড়ই নয়, এটি বড্ড ভারী। কারণ এর সঙ্গে ঝুলে আছে ভবিষ্যতের দায়।
একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি জানি, ঋণের সবচেয়ে নির্দয় দিকটি হলো সুদ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার সুদ পরিশোধেই ব্যয় করেছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ব্যয়ের প্রতি ৫ টাকার ১ টাকাই যাচ্ছে অতীতের দায় মেটাতে। এ টাকা স্কুলে যায় না, হাসপাতালে যায় না, সামাজিক সুরক্ষায় যায় না। এটি অতীতের সিদ্ধান্তের জন্য বর্তমানকে দেয়া খেসারত।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো এটা যে এই ঋণের বড় অংশ এমন সব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে বা হচ্ছে, যেগুলো থেকে রিটার্ন আসবে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কিছু প্রকল্প যেন বিশাল দালানের মতো। দূর থেকে দৃশ্যমান, কিন্তু ভেতরে আয় নেই, শুধু রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। ঋণ তখন উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ধরনের নীরব বোঝায় পরিণত হয়।
রাজস্বের শুকনো খাত, নদীর জল কমে গেলে যা হয়:
ঋণের এ স্রোত কেন থামছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে রাজস্ব ব্যবস্থার ভেতরে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বহু বছর ধরেই ৭ শতাংশের নিচে। এটি যেন একটি নদীর উৎসেই পানি কম থাকার মতো অবস্থা। রাষ্ট্রের নিজের আয় কম। অথচ ব্যয়ের প্রয়োজন বাড়ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এ ফাঁক পূরণের সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে ওঠে ঋণ। কিন্তু সহজ পথ সব সময় টেকসই হয় না।
আমাদের রাজস্ব কাঠামো এমন যে সবচেয়ে সহজে কর আদায় হয় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। ভ্যাট আর পরোক্ষ করের মাধ্যমে বাজারে গেলেই কর দিতে হয়। যে মানুষটি হিসাব করে চাল কিনছে, যে পরিবার মাস শেষে টানাটানি করছে; তাদের অজান্তেই করের বোঝা কাঁধে চাপে।
অন্যদিকে উচ্চ আয়ের বড় অংশ কর জালের বাইরে থেকে যায়। কর ফাঁকি, কর ছাড়, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা; এসব মিলিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে বৈষম্যের নীরব সহযাত্রী। গবেষণাগুলো দেখায়, কর ফাঁকি ও দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই রাজস্ব আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব। কিন্তু সেটির জন্য দরকার সেই সাহস, যা দিয়ে প্রভাবশালীদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা যায়।
বৈষম্য: অর্থনীতির নিচে জমে থাকা আগ্নেয়গিরি:
আলতাফ পারভেজ তার লেখায় যে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন, তা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি সমাজের মানসিক মানচিত্র। শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় সম্পদের প্রায় ৬০ শতাংশ। নিচের অর্ধেক মানুষের ভাগে কয়েক শতাংশও নেই।
এ বৈষম্য প্রতিদিন চোখে পড়ে। ব্যাংকে বসে দেখি, কেউ কোটি টাকা রেখে সুদের হার নিয়ে দরকষাকষি করেন, আবার কেউ কয়েক হাজার টাকা তুলতে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, আজ কি পুরো টাকাটা পাওয়া যাবে? এ দুই দৃশ্য একই অর্থনীতির ভেতরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৫ সালে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় দ্রুত গলে গেছে। অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমিয়েছে, চিকিৎসা পিছিয়েছে। এগুলো ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত মনে হলেও এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি। কারণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য থেকে সরে যাওয়া মানে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে ফেলা।
বৈষম্য শুধু সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে না; এটি অর্থনীতির গতিও শ্লথ করে। যাদের হাতে আয় নেই, তারা ভোগ করতে পারে না। ভোগ না থাকলে উৎপাদন বাড়ে না। উৎপাদন না বাড়লে বিনিয়োগ আসে না। এই চক্র একসময় পুরো অর্থনীতিকে ভারী করে তোলে, ঠিক যেন নদীতে পলি জমে স্রোত ধীর হয়ে যাওয়ার মতো।
২০২৬: মোড় নাকি ঘূর্ণি:
সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। এটি হতে পারে নদীর মোড় ঘোরানোর বছর, আবার হতে পারে একই জায়গায় ঘূর্ণির মধ্যে আটকে পড়ার সময়। এই মোড় ঘোরাতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে যে ঋণ, রাজস্ব ও বৈষম্য আলাদা সমস্যা নয়। এগুলো একটি ত্রিভুজের তিন বাহু। একটিকে না ছুঁয়ে অন্যটি ঠিক করা যাবে না।
ভবিষ্যৎ বন্ধকের অর্থনীতি: রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ভাঙা সামাজিক চুক্তির প্রশ্ন:
একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে একটি নীরব চুক্তির ওপর। এ চুক্তি কোথাও লেখা থাকে না, সংসদে পাসও হয় না। কিন্তু সবাই ধরে নেয় যে, আজ যে কর দেব, নিয়ম মানব, শ্রম দেব; তার বিনিময়ে রাষ্ট্র আগামীকাল নিরাপত্তা দেবে, সুযোগ দেবে, ন্যূনতম ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। এ অদৃশ্য চুক্তিই অর্থনীতির আসল ভিত্তি।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে যদি শুধু ঋণ, ব্যাংক বা বৈষম্যের সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে আমরা মূল জায়গায় ভুল করি। আসল সংকটটি হলো এ সামাজিক চুক্তিটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। আর সেই ভাঙনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোয়।
রাষ্ট্রের খাতা: আজকের হিসাব, আগামীকালের দায়:
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় সরকারি ঋণের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল আর্থিক ভারসাম্যের প্রশ্ন নয়; এটি প্রজন্মগত ন্যায্যতার প্রশ্ন। ২২ লাখ কোটি টাকার বেশি সরকারি ঋণ মানে শুধুই একটি বড় অংক নয়। এর অর্থ হলো যে রাষ্ট্র আজকের ব্যয়ের দায় আগামীকালের নাগরিকদের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে।
একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি জানি, ঋণ তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন ঋণগ্রহীতার ভবিষ্যৎ আয় দিয়ে তা পরিশোধ করা সম্ভব হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা আরো কঠিন। এ ভবিষ্যৎ আয় আসবে কার কাছ থেকে? যে তরুণ আজ চাকরির জন্য অপেক্ষা করছে, যে পরিবার আজ সন্তানের পড়াশোনা কমাচ্ছে, তার কাছ থেকেই কি সেই দায় আদায় হবে? এখানেই সামাজিক চুক্তির ফাটলটা স্পষ্ট হয়। মানুষ যখন দেখে আজকের সিদ্ধান্তের দায় তাদের ঘাড়ে এসে পড়ছে, অথচ সিদ্ধান্তের টেবিলে তাদের কোনো জায়গা নেই, তখন রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ক্ষয় হতে শুরু করে।
বৈষম্য: উন্নয়নের উপজাত না নীতির ফল:
আমরা প্রায়ই বৈষম্যকে ‘উন্নয়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ বলে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বৈষম্য কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি নীতির ফল। যে কর ব্যবস্থায় ভ্যাট ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ তুলনামূলক বেশি বোঝা বহন করে। যে রাষ্ট্র উচ্চ আয়ের ওপর কর আরোপে দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু নিত্যপণ্যে কর বাড়াতে দ্বিধা করে না; সে রাষ্ট্র অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
এ বৈষম্যের অর্থনৈতিক প্রভাব গভীর। ভোগ সংকুচিত হয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগ কমে, সামাজিক গতিশীলতা থেমে যায়। কিন্তু এর রাজনৈতিক প্রভাব আরো সূক্ষ্ম। মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এ ব্যবস্থা তাদের জন্য নয়।
সংস্কারের রাজনীতি: কেন কঠিন সিদ্ধান্ত সহজ হয় না:
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে সবাই যদি সমস্যা বোঝে, তাহলে সংস্কার হয় না কেন? উত্তরটি অর্থনীতির চেয়ে রাজনীতিতে বেশি। সংস্কার মানে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন। কর সংস্কার মানে প্রভাবশালীদের কাছ থেকে বেশি নেয়া। ব্যাংক সংস্কার মানে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর লাগাম টানা। ভর্তুকি সংস্কার মানে কারো না কারো আরাম কমানো। এ সিদ্ধান্তগুলো টেকনিক্যাল নয়; এগুলো রাজনৈতিক।
এখানেই রাষ্ট্র প্রায়ই দ্বিধায় পড়ে। স্বল্পমেয়াদি স্থিতি রক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পিছিয়ে দেয়া হয়। সামাজিক চুক্তির ভাষায় এটি এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতা। আজ চাপ দিও না, কাল দেখা যাবে। কিন্তু ‘কাল’ জমতে জমতে একসময় পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়।
নির্বাচনের অর্থনীতি: স্থিতি বনাম ভবিষ্যৎ:
নির্বাচনের সময় অর্থনীতি প্রায়ই হয়ে ওঠে স্থিতির হাতিয়ার। বড় সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়া হয়, কঠিন সংস্কার স্থগিত থাকে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ প্রবণতা আরো স্পষ্ট। কিন্তু স্থিতি আর টেকসই ভবিষ্যৎ এক জিনিস নয়। স্থিতি মানে আগুন নিভে আছে, ভেতরে আগুন জমছে না; এমন নিশ্চয়তা নয়। বরং অনেক সময় স্থিতির নামে সমস্যাকে চাপা দেয়া হয়, যা পরে আরো বড় বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করে। যখন তরুণরা কাজ পায় না, মধ্যবিত্ত ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত থাকে, আর দরিদ্র মানুষ টিকে থাকার লড়াই করে—তখন অর্থনৈতিক স্থিতি কেবল একটি প্রশাসনিক শব্দে পরিণত হয়।
২০২৬: নতুন সামাজিক চুক্তির সুযোগ?
এ বাস্তবতায় ২০২৬ সালকে শুধু আরেকটি অর্থবছর হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি একটি সুযোগ, নতুন করে সামাজিক চুক্তি ভাবার। এ চুক্তির ভিত্তি হতে পারে তিনটি অঙ্গীকার। প্রথমত, রাষ্ট্র তার ব্যয় ও ঋণের দায় নিয়ে নাগরিকদের সঙ্গে সৎ হবে। দ্বিতীয়ত, কর ও ব্যয়ের মাধ্যমে বৈষম্য কমানোর স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবে। তৃতীয়ত, সংস্কারের খরচ ন্যায্যভাবে বণ্টন করবে, যাতে বোঝা শুধু দুর্বলদের ঘাড়ে না পড়ে।
নতুন চুক্তির সন্ধানে বাংলাদেশ: ২০২৬ কি দায় এড়ানোর বছর, না দায়িত্ব নেয়ার মুহূর্ত?
একটি দেশ অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে অভ্যাসের জোরে। পুরনো সিদ্ধান্ত, পুরনো কাঠামো, পুরনো সমঝোতা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র এগিয়ে চলে ঠিকই। কিন্তু একসময় আসে সেই মুহূর্ত, যখন অভ্যাস আর যথেষ্ট থাকে না। তখন দরকার পড়ে সিদ্ধান্তের, দায় নেয়ার এবং কিছু প্রিয় ভ্রান্তি ছেড়ে দেয়ার সাহস। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ ঠিক সেই মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
আমরা দেখেছি ঋণের ভার, বৈষম্যের গভীরতা আর ভাঙতে থাকা সামাজিক চুক্তির চিত্র। এগুলো আলাদা সমস্যা নয়। এগুলো একই গল্পের ভিন্ন অধ্যায়। আর এ গল্পের শেষটা কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ২০২৬ সালে আমরা কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিই তার ওপর।
রাষ্ট্র কি কেবল ব্যবস্থাপক, নাকি নৈতিক অভিভাবক?
দীর্ঘদিন ধরে আমরা রাষ্ট্রকে দেখেছি একজন ব্যবস্থাপকের মতো। যে হিসাব মেলাবে, ঘাটতি সামলাবে, কোনোভাবে বছর পার করবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রের কাছ থেকে মানুষ আর শুধু ব্যবস্থাপনা আশা করছে না। তারা খুঁজছে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি বিশ্বাসযোগ্য গল্প। যখন মানুষ দেখে ঋণের দায় বাড়ছে, কিন্তু দায় নেয়ার ভাষা নেই; যখন দেখে করের বোঝা নিচে নামছে, কিন্তু উপরের দিকে প্রশ্ন নেই; তখন রাষ্ট্র আর অভিভাবক থাকে না, হয়ে ওঠে দূরের কোনো প্রশাসনিক কাঠামো। ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই যে রাষ্ট্র কি কেবল সময় পার করবে, নাকি নিজের ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে?
নতুন সামাজিক চুক্তি: কাগজে নয়, আচরণে:
নতুন সামাজিক চুক্তি মানে নতুন কোনো ঘোষণা নয়। এটি আচরণের পরিবর্তন। এর প্রথম শর্ত হলো ‘সত্য বলা’। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট করে বলতে হবে যে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, কী ঝুঁকি সামনে এবং কোন সিদ্ধান্তের খরচ কে বহন করবে। অস্পষ্টতা স্বল্পমেয়াদে আরাম দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ধ্বংস করে।
দ্বিতীয় শর্ত হলো ‘ন্যায্য বোঝা বণ্টন’। সংস্কারের খরচ যদি বারবার একই শ্রেণীর ঘাড়ে পড়ে, তবে সেটি সংস্কার নয়, পুনরাবৃত্ত বৈষম্য। উচ্চ আয়, উচ্চ সম্পদ ও প্রভাবশালী খাতকে এ খরচের অংশীদার না করলে কোনো সামাজিক চুক্তিই টেকসই হবে না। তৃতীয় শর্ত হলো ‘দৃশ্যমান প্রতিদান’। মানুষ কর দিতে রাজি হয়, কষ্ট সহ্য করে, যদি তারা দেখে এর বিনিময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা সুযোগ আসছে। অদৃশ্য উন্নয়ন আর বিমূর্ত স্থিতি দিয়ে আর সমাজকে রাজি করানো যাবে না।
আমাদের অর্থনৈতিক আলোচনার ভাষাটাও বদলানো জরুরি। এতদিন আমরা জিডিপি, প্রবৃদ্ধি আর রিজার্ভের সংখ্যা দিয়ে নিজেদের আশ্বস্ত করেছি। কিন্তু এখন মানুষ জানতে চায় যে এ সংখ্যা আমার জীবনে কী বদলাবে? ২০২৬ সালে অর্থনীতির সাফল্য মাপা যেতে পারে ভিন্ন সূচকে। মধ্যবিত্ত কি আবার সঞ্চয়ের কথা ভাবতে পারছে? তরুণ কি চাকরির বাজারে বাস্তব সুযোগ দেখছে? একজন অসুস্থ মানুষ কি চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে না? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি না বদলায়, তবে প্রবৃদ্ধির গ্রাফ যত সুন্দরই হোক, তা সমাজকে শান্ত করতে পারবে না।
এই মুহূর্তে রাজনীতির কাছে অর্থনীতির একটি নীরব প্রত্যাশা আছে। আর সেটা হলো সংস্কারকে ভয় না পেতে শেখা। সংস্কার মানে জনপ্রিয় না হওয়া সিদ্ধান্ত নেয়া। মানে কিছু স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি ছেড়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতির পথে হাঁটা। ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্রগুলো এ সাহস দেখাতে পেরেছে, তারাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিও পেয়েছে। ২০২৬ সাল রাজনীতির জন্যও একটি আয়না। এখানে দেখা যাবে যে কে ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেয়, আর কে শুধু সময় কাটাতে চায়।
সব সংকটের ভিড়েও একটি আশার জায়গা আছে। ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি বন্ধক রাখা হয়নি। সিদ্ধান্ত নেয়ার জায়গা এখনো খালি আছে। বাংলাদেশের মানুষের পরিশ্রমের শক্তি আছে। তরুণদের ভেতরে ক্ষুধা আছে। সমাজের ভেতরে এখনো ন্যায়বোধ মরে যায়নি। এ শক্তিগুলো কাজে লাগাতে পারলে ২০২৬ সত্যিই একটি মোড় ঘোরানোর বছর হতে পারে।
কিন্তু তার জন্য রাষ্ট্রকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সে কি আবারো ভবিষ্যৎকে সময়ের কাছে ঠেলে দেবে, নাকি এই মুহূর্তেই দায় নিজের কাঁধে নেবে? এ প্রশ্নের উত্তরেই লেখা হবে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অধ্যায়।
আশানুর রহমান: ব্যাংকার ও লেখক। সূত্র: বণিক বার্তা

