বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিশ্লেষকরা উদ্বিগ্ন। অর্থনীতিবিদ ফারুক হাসান বলছেন, চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয় হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়নি।
তিনি জানান, “সাধারণত, কোনো চুক্তি দুই দেশের জন্যই ‘উইন-উইন’ হওয়া উচিত। কিন্তু এই চুক্তির বেশির ভাগ শর্ত একতরফা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গেছে। আমরা মার্কিন পণ্যে শুল্কছাড়ের সুবিধা দিয়েছি এবং অন্যান্য অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। সম্প্রতি বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ফারুক হাসান: দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি আমাদের জন্য অনুকূল হয়নি। সাধারণত, যে কোনো চুক্তি দুই দেশের জন্য উইন উইন হয়ে থাকে। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষা হয়নি। একথা বলার পেছেন যুক্তি হচ্ছে, চুক্তির বেশির ভাগ শর্তই একতরফা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গেছে। আমরা মার্কিন পণ্যে শুল্কছাড় সুবিধা দিয়েছি। এর বাইরেও অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। বাংলাদেশ আগে থেকেই মার্কিন পণ্যে কম শুল্ক আরোপ করে আসছে। তারা বেশি হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্য পাল্টা শুল্ক আরোপ হওয়ার কথা নয়। তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের সব পণ্যে গড় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক ছিল ১৫ শতাংশ, যা অনেক বেশি। এর ওপর ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক। তার মানে শুল্ক এখন ৩৪ শতাংশ, যা অনেক বেশি।
প্রশ্ন: এরকম শুল্ক তো প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের পণ্যেও আরোপ রয়েছে। পাল্টা শুল্ক কোনো কোনো দেশের পণ্য বরং বাংলাদেশের পণ্যের চেয়ে বেশি।
ফারুক হাসান: পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১২৩ বিলিয়ন ডলার। দেশটির পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪৫ বিলিয়ন, দেশটির পণ্যে শুল্ক ১৮ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ২০ বিলিয়ন ডলার। তাদের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি মাত্র ৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশ। এই শুল্ক কাঠামো কি ভারসাম্যপূর্ণ হলো? এতো বেশি শুল্কের পরও আমরা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিসহ অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তাহলে লাভটা কার হলো। এসব প্রতিশ্রুতি কেবল কথার কথা নয়। বাস্তবায়ন করতে হবে। ইতোমধ্যে গমসহ অনেক পণ্য আমদানি শুরু হয়ে গেছে।
প্রশ্ন: পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হলো। এটি প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের চেয়ে কম। হ্রাসকৃত এই হার কি কোনো সুবিধা দেবে না?
ফারুক হাসান: ১ শতাংশীয় পয়েন্টের শুল্ক সুবিধায় রপ্তানি খুব বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সব দেশের পণ্যভিত্তিক একটা বিশেষত্ব আছে। এই বিশেষত্বের কারণেই চাহিদা থাকে। রপ্তানি বাড়ে। সেখানে এই সামান্য শুল্ক পার্থক্য এমন কোনো তফাৎ সৃষ্টি করবে না।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা এবং কৃত্রিম তন্তু দিয়ে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে চুক্তিতে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৭৪ শতাংশ তুলায় তৈরি। এই ৭৪ শতাংশে পাল্টা শুল্ক এড়ানোর এত বড় সুযোগ প্রতিযোগী কোনো দেশের নেই। এ বিষয়ে কী বলবেন?
ফারুক হাসান: এটা সত্য। গোটা চুক্তির মধ্যে এই একটাই গেম চেঞ্জিং পয়েন্ট। এটা আমাদের জন্য বিশাল সুযোগ। তবে এই সুবিধাপ্রাপ্তির ম্যাকানিজম কী হবে সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। এখানে আলোচনার সুযোগ এখনও আছে। এই আলোচনাটা খুব দক্ষতার সঙ্গে করা দরকার, যাতে বাংলাদেশ এখান থেকে অর্থবহ সুবিধা আদায় করতে পারে। এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি থাকাকালে ২০২৩ সালের এপ্রিলে আমি ইউএসটিআর কর্মকর্তা, ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত, আরকানসাসে যেখানে তুলা বেশি উৎপাদন হয় সেখানকার সিনেটরকে লিখেছি। তাদের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি যে দুই দেশের জন্য লাভজনক সে কথা বুঝিয়েছি।
চুক্তিতে এই সুবিধার পেছনে ওই সব উদ্যোগের কিছুটা প্রভাব আছে বলেই আমার বিশ্বাস। তখন এই ঘোষণা না আসার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন। যাই হোক, এখন সুবিধা পাওয়া গেছে সেটাই বড় কথা। তবে এই সুবিধা দেওয়ার পেছনেও মার্কিন স্বার্থ রয়েছে। কারণ দেশটির তুলা চাষিরা যে পরিমাণ তুলা উৎপাদন করে, তার ৯০ শতাংশেরই চাহিদা দেশটির নেই। ফলে রপ্তানি করা ছাড়া তাদের বিকল্প ব্যবহারে সুযোগ নেই।
সূত্র: সমকাল

