অর্থনীতি ও উন্নয়ন চিন্তায় দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকা ড. মাহবুব উল্লাহ্ দেশের উচ্চশিক্ষা ও আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা, প্রশাসন এবং ব্যাংকিং নেতৃত্ব—তিন ক্ষেত্রেই তাঁর পথচলা ছিল উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ২০১১ সাল পর্যন্ত এই দুই প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষাদান ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর একাডেমিক জীবন প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত।
শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৩ থেকে ২০০৬ মেয়াদে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় তিনি এই দুই প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেন।
শিক্ষাজীবনেও রয়েছে বিস্তৃত প্রস্তুতি। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে আরেকটি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি ভারতের জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং ১৯৯০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া ড. মাহবুব উল্লাহ্ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুই অঙ্গনেই দীর্ঘ সময় প্রভাব রেখেছেন।
প্রশ্ন: এবারের নির্বাচন কেমন হলো?
মাহবুব উল্লাহ: সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন হয়েছে। জনগণ নির্বিবাদে, বিনা বাধায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে। তাদের সুষ্ঠুভাবে কর্তব্য পালন করায় ধন্যবাদ জানাই। এই নির্বাচন বাংলাদেশে একটি আদর্শ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলো এরকমভাবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে এমনটাই আশা করি। তারপরও নির্বাচন নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কিছু সমালোচনা হয়েছে। সেসব সমালোচনা খুব বড় ধরনের সমস্যার ইঙ্গিত করে না। আশা করি, নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
প্রশ্ন: বিএনপির বিশাল বিজয়ের কারণ কী বলে মনে করেন?
মাহবুব উল্লাহ: বিএনপি একটি বড় দল। সারাদেশে এই সংগঠন বিস্তৃত। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দল বিএনপি। নির্বাচনের অনতিপূর্বে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শোকাবহ মৃত্যু এবং দেশের ইতিহাসে তাঁর বৃহত্তম জানাজা নির্বাচনী ফলকে প্রভাবিত করেছে। তা ছাড়া বিএনপির ম্যানিফেস্টো জামায়াতের ম্যানিফেস্টোর তুলনায় স্পষ্টতর হওয়ায় বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বিএনপিকে সামাজিক মাধ্যমে বিরূপ সমালোচনা এবং বিদ্রোহী প্রার্থী মোকাবিলা করতে হয়েছে। এসব সত্ত্বেও বিএনপির সাফল্য প্রশংসনীয়।
প্রশ্ন: জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট যে সংখ্যক আসন পেল, সে সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
মাহবুব উল্লাহ: এবারের নির্বাচনে জামায়াত অতীতের তুলনায় অনেক ভালো করেছে। সরকার গঠন করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন না পেলেও জামায়াতের বড় উত্থান হয়েছে। বিএনপিকে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতের দিনগুলোতে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রশ্ন: জামায়াতের এ উত্থান কি বিএনপির জন্য ভালো হলো, না উদ্বেগের কারণ আছে?
মাহবুব উল্লাহ: বিএনপিকে কী করতে হবে, তা আমি আগের প্রশ্নেই বলেছি।
প্রশ্ন: ভোটের পর বিশেষ করে জামায়াত নেতাদের প্রতিক্রিয়া দেখে আপনার কী মনে হয়, আগামী সংসদ প্রাণবন্ত হবে?
মাহবুব উল্লাহ: জামায়াত নেতাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া থেকে এটুকু বোঝা যায় যে নির্বাচনের ফল নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। জামায়াতের আমির বলেছেন, তথ্য সংগ্রহ করে তারা তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন। তবে আগামী সংসদ নিঃসন্দেহে প্রাণবন্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ এই সংসদে বিরোধী দলের প্রবল উপস্থিতি আছে। আশা করি, বিরোধী দল জামায়াত যথাযথ হোমওয়ার্ক করে সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। তবে বাড়াবাড়ি ধরনের কোনো আচরণ করলে, জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করবে।
প্রশ্ন: এবারের নির্বাচনের সঙ্গে যে গণভোটও হয়েছে, সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুলভাবে জয়যুক্ত হয়েছে। এতে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু বাস্তবায়ন হতে পারে?
মাহবুব উল্লাহ: হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ায় রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা সামনে এসেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হলো, সেই সংসদে সংস্কারের বিষয়গুলোকে আইনি সমর্থন দেওয়া হবে এবং সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আশা করি। সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে এসব সংস্কারই যে সমৃদ্ধ জাতি গঠনে যথেষ্ট, তা নয়।
প্রশ্ন: আগামী দিনে রাজনীতি কেমন হবে বলে মনে করেন?
মাহবুব উল্লাহ: আগামী দিনের রাজনীতি থেকে সংঘাত-সংঘর্ষ চিরবিদায় নেবে বলে মনে করি না। শুধু যুক্তিতর্কের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা এখনও ধাতস্থ হয়ে উঠিনি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিশীলতা অর্জন সময়সাপেক্ষ। এ জন্য আমাদের অনেক কাল অপেক্ষা করতে হবে।
প্রশ্ন: নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
মাহবুব উল্লাহ: নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে আসা উচিত কালবিলম্ব না করে ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের কাজে হাত দেওয়া। অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে যে সংকট বিদ্যমান, তা আলাপ-আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সমাধান খুঁজে বের করা। প্রফেসর ইউনূসের সরকার যে কাজগুলো শুরু করেছে, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেনি, সেগুলো পর্যালোচনা করে পূর্ণ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করি। সূত্র: সমকাল

