দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো করা হয়েছে তা ভালো না মন্দ, আমি জানি না। কিন্তু জানি, ওইগুলো কাজ করবে না। মানে, প্রস্তাবগুলো পাশ করার পরও দেখবেন খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। তারপর দশ–বারো বছর পর আবার কয়েকটা কমিশন গঠন করা হবে।
তারা ইউরোপ/আমেরিকার বিভিন্ন ডিগ্রি নিয়ে আবার কয়েক হাজার প্রস্তাব দেবে এবং যথারীতি তাও ব্যর্থ হবে। প্রস্তাবগুলো খারাপ, এই কারণে যে ব্যর্থ হবে, তা না। ব্যর্থ হবে, কারণ প্রস্তাবগুলো যাদের বাস্তবায়ন করার কথা, তারা যথেষ্ট ভালো না।
নিচের ফটোকার্ডের কথাটা বলে বছরখানেক আগে আমি প্রচুর নিন্দার মুখে পড়েছিলাম। মনে আছে, সর্বশেষ সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য, লেখক/চিন্তক, আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ ফিরোজ আহমেদ ভাই আমার এই মন্তব্যের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে দীর্ঘ একটা স্ট্যাটাস লিখেছিলেন এবং বলেছিলেন, আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে বাংলাদেশের অফিসের চেয়ার-টেবিলও অসৎ, কিন্তু বাস্তবে তা না, বাস্তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ফেরেশতা।
তার লেখাটা পড়ে আমি একরকম মজাই পাইছিলাম। ভাবছিলাম, ফিরোজ ভাই সম্ভবত অন্য কোনো বাংলাদেশের কথা লিখছেন। যে বাংলাদেশে আমি থাকি না। আমি যে বাংলাদেশে থাকি, সেই বাংলাদেশ দুর্নীতিতে পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে (ক্রিকেটের অস্ট্রেলিয়া বা ফুটবলের ব্রাজিলও যার পাশে হাস্যকর)। অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে ডিজি, সচিব, ডিসি, এসপি, পুলিশ, ডাক্তার, উকিল, জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বাসের কন্ডাক্টর, শ্রমিক ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক থেকে শুরু করে ভবঘুরে, দেড় পয়সার দামের কবি, দুই পয়সার দামের প্রকাশক অথবা ডাইনোসরের চেয়েও বৃহৎ মন্ত্রী—যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন, চোর আর বাটপারে সয়লাব।
আমি যে বাংলাদেশে বাস করি, সেই বাংলাদেশে একটা অফিসে গেলে দশ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ এক–দুইজন লোক পাওয়া যায় যিনি আর্থিকভাবে সৎ।
তো এই চোরদের দিয়ে আপনি কী সুশাসন দেবেন? আর কী ন্যায়বিচার করাবেন? যে আইনই করেন, তা ব্যর্থ হবে। আপনি নাগরিক হিসেবে থানায়, কোর্টে, হাসপাতালে বা ভূমি অফিসে যেখানে যান, অপদস্ত হবেন।
দেশে সুশাসন আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবার আগে চুরির লাগাম টানতে হবে। আর এটা করার জন্য যারা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন চেয়ারে বসে আসেন, তাদের কঠিন নজরদারীর মধ্যে রাখতে হবে। এই নজরদারী পুলিশ বা দুদক বা আদালত দিয়ে হবে না। কারণ দুর্নীতিতে এই তিন প্রতিষ্ঠানও উপরের দিকে।
ফলে এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সবাই সবার নজরদারী করতে পারে। সদিচ্ছা থাকলে এটা করা খুব কঠিন কিছু না। আপনি সব মন্ত্রী, এমপি, সচিব, সরকারী কর্মচারী, পুলিশ, জজ, উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিকদের সম্পদ বিবরণী পাবলিক করে দেন। একটা ওয়েবসাইট থাকবে, যেখানে যে কেউ উপরের পেশাগুলোতে নিয়োজিত যে কারো সম্পদের পরিমাণ দেখতে পারবে। শুধু এইটুকু নজরদারীর ব্যবস্থা করেন, দুই বছরের মধ্যে ফল পাবেন।
- ইমতিয়াজ মাহমুদ: একজন কবি। লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

