নতুন সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো, ঋণখেলাপি কমানো এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই এই সংস্কার সম্ভব; নাহলে ঋণ ঝুঁকি বাড়বে, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আব্দুল বায়েস মন্তব্য করেছেন, “নতুন সরকারের সামনে ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন, ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এটি সহজ কাজ নয়, তবে সঠিক পরিকল্পনা এবং সদিচ্ছা থাকলে পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব।”
ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও ঋণ খেলাপির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ না করা হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সরকারকে প্রথমেই আর্থিক নীতি শক্তিশালী করতে হবে, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা জরুরি। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ প্রভাবিত না হওয়া—এটাই নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি তিনি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন, ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
প্রশ্ন: নতুন সরকারের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে আপনি মনে করেন?
ড. আব্দুল বায়েস: ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ঋণখেলাপি কমানো এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। খেলাপি ঋণ বর্তমানে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর সংস্কার, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
ড. আব্দুল বায়েস: নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করা। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। মানুষ উদ্বেগমুক্ত ও নিশ্চিন্ত না হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন। বর্তমান মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, যা অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। ব্যাংক খাতের সংস্কারে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনিশ্চয়তা এখনো আছে।
প্রশ্ন: ঋণখেলাপি সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের পদক্ষেপ জরুরি?
ড. আব্দুল বায়েস: ঋণখেলাপি হারের উচ্চতা কমানো প্রধান চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন খাতকে সক্রিয় করতে হবে এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে আইনি কাঠামো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট কার্যকর নয়। এজন্য আর্থিক খাতের জন্য আলাদা বিচার ব্যবস্থা বা বিশেষ সংস্কারের প্রয়োজন।
প্রশ্ন: বৈদেশিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন সরকারের কী দায়িত্ব?
ড. আব্দুল বায়েস: ভারতের সঙ্গে ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের চুক্তি পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা এবং ভারসাম্য থাকা উচিত, যেন বিদেশি বিনিয়োগে আস্থা ফিরে আসে।
প্রশ্ন: শিক্ষা ও প্রশাসনে আপনার মূল পরামর্শ কী?
ড. আব্দুল বায়েস: শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে। প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার করা না হলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও কালো টাকার প্রবাহ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
প্রশ্ন: রাজনৈতিক সদিচ্ছার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ড. আব্দুল বায়েস: রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়। নতুন সরকার জনগণের কাছ থেকে বড় ম্যান্ডেট পেয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাস্তবমুখী সংস্কার করলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। বর্তমান সরকারও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে পারবে।
ড. বায়েসের মতে, ব্যাংক খাত সংস্কার, ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও প্রশাসনে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দমন- এই বিষয়গুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য।
সূত্র: জাগো নিউজ

