বর্তমানে হাইপারসনিক মিসাইল প্রতিযোগিতায় বারবার রাশিয়া, আমেরিকা এবং চীনসহ ৬–৭টি দেশের নাম উঠে আসে, যদিও বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত এই অভাবনীয় অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে মাত্র দুটি দেশ। আর সেই দুটি দেশ হলো রাশিয়া এবং ইরান। যদিও এই প্রযুক্তি উন্নয়ন ও গবেষণায় বিগত এক দশকে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, হাইপারসনিক গতি (Hypersonic speed) বলতে শব্দের গতির চেয়ে অন্তত ৫ গুণ বা তার বেশি দ্রুত গতিকে বোঝানো হয়। এটি সাধারণত ম্যাক ৫ (Mach 5) বা ঘণ্টায় ৬,১০০ কিলোমিটার (৩,৮০০ মাইল) এর বেশি বেগ বোঝায়, যেখানে এক ম্যাক সমান ১,২২৫ কিলোমিটার ধরা হয়। এই গতিতে চলা বস্তুগুলো অত্যন্ত দ্রুত, নির্ভুল এবং মাঝ আকাশে দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম, যা প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য শনাক্ত ও আটকানো প্রায় অসম্ভব বলে বিবেচিত।
বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের দিক দিয়ে, রাশিয়া ইতোমধ্যেই তার হাইপারসনিক (কিনঝান, জিরকন) মিসাইল ইউক্রেনের উপর নিক্ষেপ করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দ্বারা এটি ইন্টারসেপ্ট বা প্রতিহত করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়েছে। অন্যদিকে, গত ২০২৫ সালের মে মাসে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সফলভাবে কিছু হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার করেছে ইরান।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুন মাসে, ইসরায়েল, আমেরিকা এবং আরব দেশগুলোর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের বাধা অতিক্রম করে ইরানের কিছু ফাতাহ-১/২ সিরিজের ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ হাইপারসনিক মিসাইল সুনির্দিষ্ট টার্গেটে আঘাত হানে। ফাতাহ সিরিজের হাইপারসনিক মিসাইলের রেঞ্জ প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার এবং গতি আনুমানিক ম্যাক ১৩ বা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬,০০০ কিলোমিটার।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে, ইরান বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছে নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি ২,০০০ কিলোমিটার রেঞ্জের হাইপারসনিক গতির খোররামশহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র (খাইবার) ব্যালিস্টিক মিসাইল। প্রায় ৩০ টন ওজনের এই মিসাইলের গতি বায়ুমণ্ডলের বাইরে ১৬ ম্যাক এবং বায়ুমণ্ডলের ভেতরে ৮ ম্যাক। যদিও এটি এখনও পর্যন্ত কোন যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি।
গত ২০২২ সাল থেকে, রাশিয়া তার নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি অত্যাধুনিক ৯ ম্যাক গতি সম্পন্ন এয়ার-লঞ্চড বেসড কেএইচ-৪৭এম২ (কিনঝাল) এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে ‘জিরকন’ হাইপারসনিক মিসাইল নিক্ষেপ করে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এসব মিসাইলের গতি প্রায় ম্যাক ৯ বা ১১,১৮৩ কিলোমিটার। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে এটিকে গেম-চেঞ্জার অস্ত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রয়োগ করা যায়নি।

অন্যদিকে, চীন তৈরি করেছে নিজস্ব প্রযুক্তির ডিএফ-১৭ হাইপারসনিক মিসাইল, যা ম্যাক ৫–১০ গতির DF-ZF গ্লাইড ভেহিকল ব্যবহার করে বলে দাবি করা হয়। এছাড়াও, প্রায় ম্যাক ৬ গতির ক্যারিয়ার কিলার খ্যাত ওয়াইজে-২১ এন্টিশিপ মিসাইল রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানতে সক্ষম। এর পাশাপাশি, চীন একটি নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বহনকারী Jinglei-1 (JL-1) হাইপারসনিক মিসাইল তৈরি করেছে।
তবে বিশ্বের এক নম্বর সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে হাইপারসনিক গ্লাইড বডি (C-HGB) সিস্টেম। দাবি করা হয়, এর গতি প্রায় ১৭ ম্যাক বা তার কাছাকাছি হতে পারে। যদিও আমেরিকার সামরিক বাহিনীর এই প্রযুক্তি অর্জনে বিনিয়োগের বিপরীতে বাস্তব সাফল্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
গত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘পেন্টাগন’ জানায় যে, ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে “ডার্ক ঈগল” নামে পরিচিত লং-রেঞ্জ হাইপারসনিক ওয়েপন (LRHW) সিস্টেমের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের সফলতার পর দেশটির দ্বিতীয় সফল পরীক্ষা।
ইউএস এয়ারফোর্স বর্তমানে লকহিড মার্টিন কর্পোরেশনের তৈরি নতুন প্রজন্মের AGM-183A এয়ার-লঞ্চড বেসড হাইপারসনিক মিসাইল নিয়ে কাজ করছে। যদিও ২০২৩ সালের মার্চে প্রোগ্রামটি একাধিক ব্যর্থতার কারণে বাতিল হয়েছিল, পরে আবারও চালু করা হয়েছে।
ভারত ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নয়নাধীন একটি দূরপাল্লার হাইপারসনিক এরিয়াল সিস্টেমের প্রথম সফল ফ্লাইট পরীক্ষা সম্পন্ন করে। এছাড়াও, চলতি ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা DRDO দীর্ঘ ১২ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে একটি ফুল-স্কেল ‘অ্যাক্টিভলি কুলড স্ক্র্যামজেট’ ইঞ্জিনের সফল গ্রাউন্ড টেস্ট পরিচালনা করে। তবে এসব সাফল্য সত্ত্বেও ভারতের হাইপারসনিক কর্মসূচি এখনও গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D)-এর প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের দিকে IDEF প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে তুরস্ক তাদের টাইফুন (Typhoon) ব্লক-৪ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে। এছাড়াও, চলতি ২০২৬ সালের মধ্যে তুরস্ক ব্যাপক উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। টাইফুন ব্লক-৪ হলো তুরস্কের দীর্ঘ-পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল পরিবারের হাইপারসনিক সংস্করণ, যা উড্ডয়নের বেশিরভাগ সময়েই ম্যাক ৫-এর বেশি গতিবেগ বজায় রাখতে সক্ষম।
এদিকে, উত্তর কোরিয়াও এবার হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তিতে অগ্রগতির দাবি করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তারা হোয়াসং-১৬বি মিসাইলে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল যুক্ত করে পরীক্ষা সম্পন্ন করে। দাবি করা হয়, এটি প্রায় ম্যাক ১২ গতিতে চলতে পারে এবং প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম।
পরিশেষে বলা যায়, এই অতি উচ্চ প্রযুক্তির হাইপারসনিক গতির মিসাইল সিস্টেম ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের পাশাপাশি ইরান, ভারত এবং উত্তর কোরিয়া অনেকটাই এগিয়ে আছে বলে মনে করা হয়। তবে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এই জাতীয় অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রয়োগ হয়, যা বিশ্বকে নতুন এক হাইপারসনিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
- সিরাজুর রহমান: শিক্ষক ও লেখক, সিংড়া, নাটোর।

