বাংলাদেশের অর্থনীতি গত প্রায় ১৮ মাস ধরে এক ধরনের কাঠামোগত স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক শত গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ তারল্য অলস পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ অর্থ আছে, কিন্তু অর্থের গতি নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য প্রায় ৩ লাখ ৬ হাজার কোটি পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকগুলো ঋণে রূপান্তর করতে পারছে না, কারণ বিনিয়োগ ও ঋণ চাহিদা কম। ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে জমা টাকা বড় হলেও জমাকৃত সেই অর্থ শিল্প ঋণে রূপান্তরিত করতে পারেনি।
‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় ২৪ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, “বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার নিচে নেমে আসায় বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি হয়েছে। কঠোর মুদ্রানীতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক অক্টোবর-ডিসেম্বরে ব্যক্তি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম। নতুন বিনিয়োগ না বাড়ায় প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে।”
রপ্তানিমুখি তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ-এর তথ্য অনুসারে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১৮২-১৮৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার অন্যতম কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা না পাওয়া। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তা বলেছেন যে ক্রেডিট গ্রোথ ও নতুন বিনিয়োগ ধীর হওয়ার ফলে শিল্প খাতে পুঁজির সরবরাহই হচ্ছে না, ফলে কর্মসংস্থানসহ শিল্প সম্প্রসারণে বাধা তৈরি হচ্ছে।
এ অবস্থায় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। বাস্তবতা হলো—সরকার এককভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না; তা করতে হয় বেসরকারি খাতকে সক্রিয় করে। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান হয় না; আর বিনিয়োগ হয় তখনই, যখন নীতিগত পরিবেশ আস্থাজনক ও ঝুঁকি-সহনশীল।
প্রচলিত অর্থনীতি বনাম উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি
প্রচলিত একাডেমিক অর্থনীতি সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব শৃঙ্খলা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু অর্থনৈতিক রূপান্তরের পর্যায়ে অনেক সময় ‘কনজারভেটিভ স্থিতিশীলতা’ যথেষ্ট নয়। উন্নয়ন-অর্থনীতির ইতিহাস দেখায় যে, বহু দেশ ঝুঁকিনির্ভর নীতির মাধ্যমে অগ্রগতি অর্জন করেছে।
উদাহরণ ১: যুক্তরাষ্ট্র – ২০০৮ আর্থিক সংকট
২০০৮ সালে জেনারেল মোটরস (GM) ও ফোর্ড দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়ে। মার্কিন সরকার TARP কর্মসূচির মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়। সমালোচনা ছিল প্রবল। কিন্তু আজ GM পুনরায় লাভজনক হয়েছে। এই সহায়তা শুধু কোম্পানি নয়, একটি সম্পূর্ণ সাপ্লাই চেইন—স্টিল, যন্ত্রাংশ, পরিবহন—বাঁচিয়ে দেয়।
উদাহরণ ২: টেসলা ও প্রাথমিক রাষ্ট্রীয় সহায়তা
টেসলা একসময় প্রায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০০৯ সালে প্রায় ৪৬৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। পরে টেসলা সেই ঋণ তো পরিশোধ করেছেই, এখন বিশ্বের শীর্ষ মূল্যবান কোম্পানির একটি। উচ্চ ঝুঁকির সহায়তা উচ্চ ফল দিয়েছে।
উদাহরণ ৩: দক্ষিণ কোরিয়া–রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন
১৯৬০–৮০ দশকে দক্ষিণ কোরিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল, শিল্প সুরক্ষা ও লক্ষ্যভিত্তিক ঋণনীতি অনুসরণ করে। হুন্দাই, স্যামসাং, এলজি—সবই রাষ্ট্রীয় সহায়তার পরিবেশে বেড়ে ওঠে।
উদাহরণ ৪: কানাডা–স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্প
মার্কিন ট্যারিফের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্টিল শিল্পকে কানাডা সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ সহায়তা দিয়েছে। কারণ একটি বড় শিল্প বন্ধ হলে শুধু কারখানা নয়, খনি, পরিবহন, স্থানীয় ব্যবসা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনীতিতে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ কাজ করে।
ঝুঁকি-ফেরত তত্ত্ব (Risk–Return Trade-off)
অর্থনীতির মৌলিক নীতি:
Higher Risk→ Higher Expected Return
ব্যবসায় বিনিয়োগ মানেই অনিশ্চয়তা। কিন্তু রাষ্ট্র যদি কেবল ঝুঁকি এড়িয়ে চলে, তাহলে প্রবৃদ্ধি সীমিত হয়। একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতিও অনেকটা পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টের মতো—শুধু নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করলে গড় প্রবৃদ্ধি কম হবে।
গভর্নর নিয়োগ: দক্ষতা বনাম প্রচলিত পরিচিতি
সদ্য নিয়োগ-কৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একজন পেশাদার হিসাবরক্ষক ও উদ্যোক্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার পরেও হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পেশাদার সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Institute of Cost and Management Accountants of Bangladesh (ICMAB) থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী।
১৯৭২ সালে যখন এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে তখন এর নাম ছিল Bangladesh Institute of Industrial Accountants. বাংলাদেশের গড়পড়তা শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের মতো চকুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়েছেন নিজেই শিল্পোদ্যোক্তা।
প্রশ্ন হলো—একজন একাডেমিক অর্থনীতিবিদ নাকি একজন ব্যবসায়িক অভিজ্ঞ ব্যক্তি—কে বেশি কার্যকর?
ইতিহাস বলছে, অনেক সময় অপ্রচলিত পটভূমির ব্যক্তিরা সংকটময় সময়ে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। জার্মানির অর্থমন্ত্রী ছিলেন ট্যাক্স আইনজীবী। কানাডার অর্থমন্ত্রী ছিলেন অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিক। কানাডা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে একজন বিনিয়োগকারীকে নিয়োগ দিয়েছে, কূটনীতিক নয়—কারণ সামনে বাণিজ্য চুক্তি নবায়ন। অর্থাৎ, সংকটের প্রকৃতি অনুযায়ী নেতৃত্বের ধরন পরিবর্তন করা হয়।
শিল্পনীতি ও ঋণ পুনঃতফসিল: সীমা কোথায়?
নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় যে বিতর্ক তা হলো ২০২৫ সালের জুন মাসে তিনি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে তার কোম্পানির নেওয়া ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন ব্যাংকিং আইন অনুসরণ করে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে। শিল্প-বাণিজ্যে ঋণ পুনঃতফসিল কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। উন্নত অর্থনীতিতে এটি ব্যবসার স্বাভাবিক অংশ।
তবে দুটি শর্ত গুরুত্বপূর্ণ: আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ; দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি সংস্কৃতি তৈরি না হওয়া। যদি কোনো শিল্প সাময়িক সংকটে পড়ে কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় হয়, তাহলে তাকে বাঁচানো যৌক্তিক। কিন্তু যদি প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে লোকসান করে ও জনগণের করের অর্থ অপচয় করে, তাহলে সহায়তা নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের বর্তমান দ্বিধা
গত ১৮ মাসে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এলেও প্রবৃদ্ধি-উদ্দীপনা কম। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি হয়েছে আংশিকভাবে আমদানি হ্রাসের কারণে—যা ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক বহন করে।
এখন প্রশ্ন:বাংলাদেশ কি ‘স্থিতিশীল কিন্তু ধীর’ অর্থনীতি চায়, নাকি ‘ঝুঁকিনির্ভর দ্রুত সম্প্রসারণ’?
এক কোটি কর্মসংস্থান: বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা
এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন:
- রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণ
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণপ্রাপ্তি
- কৃষি-প্রযুক্তি ও ভ্যালু চেইন উন্নয়ন
- অবকাঠামো বিনিয়োগ
- আর্থিক নীতিতে ব্যবসা-বান্ধব নমনীয়তা
এই লক্ষ্য অর্জনে প্রচলিত চিন্তার বাইরে যাওয়া প্রয়োজন—কিন্তু ঝুঁকির সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া নয়।
ঝুঁকি, আস্থা, ও দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কৌশলগত পদক্ষেপ। এতে সফলতার সম্ভাবনা যেমন আছে, ব্যর্থতার ঝুঁকিও তেমনি বড়। সফল হলে—শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, আস্থা ফিরবে। ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে, আর্থিক খাতের চাপ বৃদ্ধি পাবে, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্রনীতি অনেকটা উদ্যোক্তার সিদ্ধান্তের মতো—ঝুঁকি নিতে হয়, তবে হিসাব করে। আমি আশা করি এই ঝুঁকি সফল হবে। কারণ এর সফলতা শুধু সরকারের নয়, দেশের মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
- মোস্তফা কামাল পলাশ: একজন আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক। বর্তমানে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব সাসকাচেওয়ানে পিএইচডি গবেষণারত। সূত্র: বিডিনিউজ২৪

