ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ তাঁর মেয়ে ও নাতি নিহত হয়েছেন। প্রধান সামরিক কমান্ডার, প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ মোট ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্প বলছেন— “বিজয়।” নেতানিয়াহু বলছেন— “এক্সিস্টেনশিয়াল থ্রেট দূর হইছে।” লস এঞ্জেলেসে উদযাপন চলছে। প্রশ্ন একটাই— একটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হইলেই কি বিজয় নিশ্চিত হয়?
ইতিহাস কী বলে?
ইরাক, ২০০৩। সাদ্দামের মূর্তি ভেঙেছে ৯ এপ্রিল। বুশ “মিশন অ্যাকম্পলিশড” ঘোষণা করেছে ১ মে। তারপর আট বছর যুদ্ধ। চার হাজার চারশো আমেরিকান সেনা নিহত। দুই লাখ থেকে ছয় লাখ ইরাকি নিহত।
ইরাকের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিয়েছে ISIS। সেই প্রেতাত্মা আমেরিকানদের এখনো তাড়া করে বেড়ায়।
লিবিয়া, ২০১১। গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়। ন্যাটো বলেছিল— সফল অপারেশন। আজ তেরো বছর পরেও লিবিয়ায় দুটো সরকার। ইউরোপের মাইগ্রেশন ক্রাইসিসের উৎস। কোনো কার্যকর রাষ্ট্র গড়ে ওঠে নি।
আফগানিস্তান, ২০০১-২০২১। তালেবানকে “পরাজিত” করেছে এক সপ্তাহে। বিন লাদেনকে মেরেছে ২০১১-তে। বিশ বছর থেকেছে। ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ। ২,৪০০ আমেরিকান সেনা মারা গেছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলে হেঁটে ঢুকেছে— যেন কিছুই হয় নি।
ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম যুদ্ধ কেবলই যুদ্ধ না। এই যুদ্ধ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিছিল। আমেরিকা এই যুদ্ধে শুধু হারে নি। ন্যাক্কারজনকভাবে হেরেছে। কারণ একটাই— সামরিক আধিপত্য দিয়ে রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করা যায় না।
প্যাটার্নটা খেয়াল করুন
চারটা দেশ। চারটা দশক। একই স্ক্রিপ্ট—
এক. প্রথম সপ্তাহে সামরিক বিজয়। দুই. রাজনৈতিক শূন্যতা। তিন. অভ্যন্তরীণ বিভাজন— জাতিগত, সাম্প্রদায়িক, গোষ্ঠীগত। চার. ইনসার্জেন্সি— যা দশকব্যাপী চলে। পাঁচ. প্রত্যাহার অথবা স্থায়ী সংকট। ছয়. আগের “শত্রু” বা তার চেয়ে ভয়ংকর কিছু সেই শূন্যতা পূরণ করে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার ইরান হামলার মাত্র তিনদিন আগে বলেছিলেন— ইসরায়েল ছাড়া পৃথিবীর প্রতিটি দেশ ট্রাম্পকে এই হামলা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান বলেছেন— ভালো কোনো সামরিক অপশন নেই। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে যা জেতা সম্ভব না।
কেউ শোনে নি।
তিনটা কারণে খামেনির হত্যা এই যুদ্ধ জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না
এক. ইরান এক-ব্যক্তির রাষ্ট্র না।
ইরানের সিস্টেম ভিন্ন। গার্ডিয়ান কাউন্সিল, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস, IRGC, বিচার বিভাগ, বাসিজ — সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামো। ৪৫ বছর ধরে ঠিক এই পরিস্থিতির জন্যই তৈরি হইছে। একজন নেতা নিহত হলে পুরো সিস্টেম নিহত হয় না। বরং সিস্টেম আরো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।
IRGC-র ১ লাখ ৯০ হাজার সক্রিয় সেনা। নিজস্ব নৌবাহিনী। নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা। নিজস্ব অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। খামেনিকে মারলে IRGC ভেঙে যায় না। বরং র্যাডিকালাইজড হতে পারে।
দুই. শাহাদাত ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক রিসোর্স।
এটা পশ্চিমা স্ট্র্যাটেজিস্টরা বারবার বুঝতে ব্যর্থ হয়।
শিয়া রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বে শাহাদাত পরাজয় না— চূড়ান্ত বিজয়। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) হেরেছিলেন। সেই “পরাজয়” চৌদ্দশ বছর ধরে একটা রাজনৈতিক আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছে।
জীবিত খামেনি ছিলেন একজন ৮৬ বছর বয়সী, ক্রমশ অজনপ্রিয় নেতা। অর্থনৈতিক পতন ও গণবিক্ষোভের মুখে দাঁড়ানো। খামেনি আমেরিকা ও ইসরায়েলের হাতে নিহত হন পবিত্র রমজানে। এটা আর সাধারণ কোনো মৃত্যু থাকে না। এটা একটা প্রতীক— যা তাঁকে ঘৃণাকারী ইরানিদেরও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। চল্লিশ দিনের শোক শুধু আচার না। এটা রাজনৈতিক মবিলাইজেশন টুল।
তিন. “এরপর কী” প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
ট্রাম্প বলছেন— ইরানের জনগণ “দেশ ফিরিয়ে নাও।” কীভাবে? কাদের দিয়ে?
নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির ইরানের ভেতরে কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই। মুজাহেদিন-এ-খালক ইরানের ভেতরে ব্যাপকভাবে ঘৃণিত। জানুয়ারি ২০২৬-এর বিক্ষোভ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও নেতৃত্বহীন— প্রতিবাদের জন্য শক্তিশালী, শাসনের জন্য অকার্যকর।
আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষকরা আজই বলেছেন— বোমাবর্ষণ গণঅভ্যুত্থানকে সহজ করে না, কঠিন করে। মানুষ মিসাইলের নিচে প্রতিবাদ করে না। আশ্রয় খোঁজে।
ইরাকে সাদ্দামকে হত্যা করা হয়। ইরাক শান্ত হয় নি। লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়। লিবিয়া শান্ত হয় নি। আফগানিস্তানে বিশ বছর যুদ্ধ। তালেবান শেষ হয়ে যায় নি।
এবার ইরান। খামেনি নিহত হলো। এরপর?
বোমা ফেলা হয় শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু ফিরে আসে প্রতিশোধ।
লেখক—ফেরদৌস হোসেন: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
বিজনেস, ডেটা প্রাইভেসি, ও এআই ল’য়ার।

