সত্যিকারের নেতৃত্বের মূল্যায়ন কথায় নয়, কাজে নির্ধারিত হয়। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সমাবেশে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেকে এক চিন্তাশীল রাষ্ট্রনায়কের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছিলেন। জানুয়ারিতে দেওয়া তাঁর সেই ভাষণকে এমন শ্রদ্ধা ও সমর্থনের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছিল, যা সাধারণত বৈশ্বিক দায়িত্ববোধ নিয়ে কথা বলা নেতাদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
দাভোসে কার্নির উপস্থিতির মাধ্যমে সম্ভবত এই বার্তাও দেওয়া হয়েছিল যে অস্থির ও বিশৃঙ্খল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কানাডা একটি সংযত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চায়।
সেই বক্তব্যে তিনি ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিপদের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি সংযমের কথা বলেছিলেন এবং বিশ্বের শক্তিধর সরকারগুলোকে বেপরোয়া উত্তেজনা বৃদ্ধির সহজ প্রলোভন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কার্নির সেই ভাষণ এখন নীতিগত অবস্থান ও দৃঢ় বিশ্বাসের প্রকাশের চেয়ে বরং এক ধরনের নৈরাশ্যজনক ও অস্থায়ী কাহিনির মতো মনে হচ্ছে। অনুমানযোগ্যভাবেই অবস্থান বদলে কার্নি এমন একটি যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন, যার বিষয়ে তিনি আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে বিচক্ষণ রাষ্ট্রগুলোর তা শুরু করা এড়িয়ে চলা উচিত।
ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চলছে—যা একদিকে দৃঢ় অবস্থানে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং অন্যদিকে কূটনীতি ও সংযমে অনাগ্রহী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে—তা অনেকের চোখে সেই তাড়াহুড়ো ও আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তেরই স্পষ্ট উদাহরণ, যার বিষয়ে কার্নি আগে অবিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে সংযত ও পরিমিত রাষ্ট্রনীতির নতুন রক্ষক হিসেবে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেটি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে যখন তিনি নিশ্চিত করেন যে তাঁর আগের অনেক অনুগত নেতার মতোই ওয়াশিংটনের আহ্বানে অটোয়া শেষ পর্যন্ত সমর্থন জানিয়েছে। পুরোনো ও পরিচিত সেই প্রবণতাই আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাজনীতিতে প্রবেশের সময় কার্নি যে সংযত বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত ছিলেন—যা কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং পরে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের সময় গড়ে উঠেছিল—এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি অনেকের কাছে দূরদর্শিতা ও আত্মসমালোচনার ঘাটতির একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে ধরা দিচ্ছে।
কার্নির সমর্থকেরা তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি তাঁর খামখেয়ালি রক্ষণশীল প্রতিদ্বন্দ্বীর আদর্শিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপরীতে একটি সংশোধনী শক্তি হয়ে উঠবেন—একজন প্রযুক্তিবিদ ধাঁচের রাজনীতিক, যিনি স্লোগানের বদলে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং তাড়াহুড়োর বদলে বিবেচনাশীলতার পথ বেছে নেবেন। কিন্তু এই গভীর সংকটময় যুদ্ধকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দিয়েছে, সেই বিভাজন আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী ছিল।
এখন কার্নি প্রমাণ করেছেন যে তিনি সেই সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রকৃত প্রতিষেধক নন, যাকে অতিক্রম করার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন। বরং তিনি কেবল তারই আরও সাবলীল ভাষায় প্রকাশকারী রক্ষক। মনোমুগ্ধকর বক্তৃতা দেওয়া সহজ। কিন্তু ক্ষমতাবান এক প্রেসিডেন্টের সমর্থিত যুদ্ধকে চ্যালেঞ্জ করা যে অনেক কঠিন, তা এখন স্পষ্ট।
যুদ্ধ প্রায়ই নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার উচ্চকণ্ঠ ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার সামান্য ধারণা থাকলেও বোঝা যায়, সেগুলো কখনোই এত সহজভাবে এগোয় না। যুদ্ধ সব সময়ই কিছু কোমল শব্দ তৈরি করে—যেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত ক্ষতি বা অনিচ্ছাকৃত প্রাণহানি। কিন্তু সেই নির্বীজ শব্দগুলোর আড়ালের থমকে যাওয়া বাস্তবতা খুবই সরল। স্কুলশিশুরা মারা যায়।
যেসব শিশু পরমাণু বিরোধ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা মধ্যপ্রাচ্য ও তার বাইরের অঞ্চলে আবারও শুরু হওয়া উন্মত্ততার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়।
মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত ১৬৫ জন ইরানি স্কুলছাত্রী ও শিক্ষাকর্মীর ঘটনা—যারা সবাই এই সংঘাতের নিরীহ শিকার—যে কোনো সরকারকে থেমে চিন্তা করতে বাধ্য করার কথা, যদি তারা সত্যিই মানবিকতা ও স্থিতিশীলতার প্রতি আনুগত্যের দাবি করে।
কিন্তু তার বদলে কার্নি এবং তাঁর অনুগত সঙ্গীরা এমন একটি যুদ্ধকে সমর্থন করে যাচ্ছেন, যার মানবিক পরিণতি প্রতিদিনই নতুন নতুন বেদনাদায়ক বিবরণে সামনে আসছে।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, যে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধকে কার্নি সমর্থন করছেন তাঁর চরিত্র কেমন।
কানাডা এমন এক অস্থির ও উগ্র নেতাকে সহায়তা করছে, যিনি একই সঙ্গে কানাডার সার্বভৌমত্ব মুছে ফেলার কথাও প্রকাশ্যে বিবেচনা করেছেন এবং আবার নিজের পছন্দের যুদ্ধে সমর্থন দাবি করেছেন।
এই অদ্ভুত অবস্থানের পেছনে কোনো সুসংগত যুক্তি থাকলে তা বোঝা কঠিন।
সম্ভবত অটোয়ার হিসাব হলো—আজ আনুগত্য দেখালে আগামীকাল কিছু সদিচ্ছা পাওয়া যেতে পারে।
যদি সেটাই হয়ে থাকে, তবে তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর রাজনৈতিক প্রবৃত্তিকে গুরুতরভাবে ভুল বোঝারই প্রমাণ। তিনি এমন এক নেতা, যিনি ছাড়কে দুর্বলতা এবং আনুগত্যকে অধিকার হিসেবে দেখেন। যে মিত্ররা সহজে অনুগত হয়, তারা সম্মান পায় না; বরং আরও দাবির মুখে পড়ে।
এ কারণেই ট্রাম্পের প্রতি কানাডার এই নতিস্বীকার শুধু নৈতিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ নয়, কৌশলগতভাবেও সরলতার পরিচয়।
তবে সব পশ্চিমা সরকার একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর নেতৃত্বের সামনে মাথা নত করেনি।
মাদ্রিদে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ কার্যত ট্রাম্পের যুদ্ধকে বিপজ্জনক বোকামি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, এই যুদ্ধ সমস্যার সমাধান না করে বরং আঞ্চলিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
সানচেজ বুঝতে পারেন, যুদ্ধের পরিণতি সব সময়ই গভীর এবং বিকৃতকারী প্রভাব সৃষ্টি করে, যা ঘোষিত কারণগুলোর অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
প্রত্যাশিতভাবেই ট্রাম্প এর জবাবে হুমকি দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, সানচেজ যদি নতি স্বীকার না করেন তবে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারে।
এটি ছিল ট্রাম্পের পরিচিত কৌশল—কূটনীতির আড়ালে ভয় দেখানো। কিন্তু সানচেজ পিছিয়ে যাননি।
ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে স্পেনের ভূখণ্ডে থাকা ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের ভেতরে বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ এক প্রতিবাদের উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে সানচেজ স্পষ্ট করে বলেন, বিদেশি কোনো প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে স্পেন এমন কোনো যুদ্ধে অংশ নেবে না, যা তার মূল্যবোধ ও স্বার্থের পরিপন্থী।
তিনি এই সিদ্ধান্তকে নীতিগত জরুরি প্রশ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ভাষায়, স্পেন আর বিশৃঙ্খলা, মৃত্যু এবং বিপর্যয়ের অংশীদার হবে না।
ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ উত্তরাধিকার স্মরণ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সেই ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি না করা এবং সেই যুদ্ধ যে ট্রমা ও ধ্বংস ডেকে এনেছিল তা এড়িয়ে চলা।
কার্নি সানচেজের এই বিচক্ষণ পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এ বছরের শুরুতে দাভোসে দেওয়া নিজের বক্তৃতার মূল ধারণাগুলোকেও অগ্রাহ্য করেছেন।
সহিংসতার বিরোধিতা করার বদলে তিনি সেটিকে সম্ভব করেছেন। সংযমের আহ্বান জানানোর বদলে তা ত্যাগ করেছেন। অন্য একটি দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার বদলে তিনি তার লঙ্ঘনকে অনুমোদন দিয়েছেন। আর ইরানি স্কুলছাত্রীদের জীবনের মূল্য দেওয়ার বদলে তাদের মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার মূল্য হিসেবেই দেখেছেন।
এর সম্পূর্ণ বিপরীতে সানচেজ অতীত যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে নতুন এক যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি স্পেনকে নতুন শোকের সূচনাবিন্দুতে পরিণত করার অনুরোধে না বলেছেন। তিনি এক দাপুটে নেতার হুমকি ও চাপ উপেক্ষা করেছেন। অন্যরা যখন যুদ্ধকে সমর্থন করেছে, তখন তিনি যুদ্ধকে না বলেছেন।
কার্নি নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে অনুসরণ করার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি নৈতিক অবস্থান ত্যাগ করে জড়িত থাকার পথ গ্রহণ করেছেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বিচার করা হবে তিনি কী বলেছেন তার জন্য নয়, বরং তিনি কী করেছেন তার জন্য।
মতামত— অ্যান্ড্রু মিত্রোভিকা, আল জাজিরার কলাম লেখক, সূত্র:আল জাজিরা

