বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার গত দুই দশকে অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী তরুণদের সংখ্যাও। প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী ডিগ্রি হাতে নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়শই ভিন্ন—ডিগ্রি অর্জনের পরও অনেক তরুণ দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত চাকরির সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। ফলে সমাজে ক্রমেই উচ্চারিত হচ্ছে এক হতাশার প্রশ্ন: ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই—সমস্যা কোথায়?
এই প্রশ্ন কেবল ব্যক্তিগত হতাশার প্রতিফলন নয়; বরং এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং কর্মবাজারের কাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হচ্ছে বিপুল সংখ্যক স্নাতক, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে তৈরি হচ্ছে না। পাশাপাশি দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্য এবং তরুণদের কর্মজীবন সম্পর্কে প্রস্তুতির অভাব—সব মিলিয়ে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাই বিষয়টি কেবল “চাকরি পাওয়া” বা “চাকরি না পাওয়া”-এর সীমায় আটকে নেই; বরং এটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষার মান এবং অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই বাস্তবতার আলোকে “ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই—সমস্যা কোথায়?” শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি সমস্যার মূল কারণ, বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং সম্ভাব্য সমাধানের দিকগুলো বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবে।
ডিগ্রি অর্জন করেও অনেক তরুণ-তরুণীর চাকরি না পাওয়ার পেছনে একাধিক বাস্তব কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার তাত্ত্বিক জ্ঞান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে বড় ধরনের অমিল। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞানের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আধুনিক কর্মবাজারে নিয়োগকর্তারা কেবল সিজিপিএ বা ডিগ্রির দিকে তাকিয়ে থাকেন না; তারা খোঁজেন ব্যবহারিক দক্ষতা। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের সক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা এখন নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল অর্জন করেও চাকরির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
এছাড়া কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাবও বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ইন্টার্নশিপ, পার্ট-টাইম কাজ বা প্রকল্পভিত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায় না, কিংবা এসব বিষয়ে তেমন গুরুত্বও দেয় না। এর ফলে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় তাদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত থাকে। একইভাবে পেশাগত যোগাযোগ বা নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রেও অনেকেই পিছিয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে পেশাগত যোগাযোগ, অনলাইন প্রোফাইল বা অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অনেক তরুণ এসব সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না।
অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনও কর্মসংস্থানের ধরণকে বদলে দিচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা ডেটা-সংক্রান্ত কাজের মতো আধুনিক দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী এসব নতুন দক্ষতা অর্জনের দিকে তেমন মনোযোগ দেয় না। ফলে কর্মবাজারের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রভাব। অনেক সাধারণ বা জুনিয়র পর্যায়ের কাজ এখন ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ায় নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রও কিছুটা সংকুচিত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি চাকরি নিয়ে সামাজিক মানসিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশে এখনো অনেক তরুণ কেবল সরকারি চাকরিকে লক্ষ্য হিসেবে ধরে এগিয়ে যায়। ফলে বেসরকারি খাত, দক্ষতাভিত্তিক পেশা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। আবার অনেকেই পার্ট-টাইম বা এন্ট্রি-লেভেল কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনের গুরুত্বও যথাযথভাবে উপলব্ধি করে না।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চাপে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, শিল্পখাতে বিনিয়োগের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব সামগ্রিক কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করেছে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির গতি আগের তুলনায় কিছুটা কমে এসেছে, যা তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি চাকরির সুযোগ দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণের তুলনায় খুবই সীমিত। একটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে সেখানে হাজার হাজার প্রার্থী আবেদন করেন, ফলে প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে অত্যন্ত কঠিন। একই সময় বেসরকারি খাতেও নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল ডিগ্রি নয়, বরং দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় অনেক নতুন স্নাতক দীর্ঘ সময় ধরে উপযুক্ত চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে তরুণ সমাজে অনিশ্চয়তা ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, ডিগ্রি থাকার পরও চাকরি না পাওয়ার সমস্যাটি একক কোনো কারণের ফল নয়। বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার ঘাটতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারা, চাকরি সম্পর্কে প্রচলিত মানসিকতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই আজকের তরুণদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছে।
ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পাওয়ার এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত পরিবর্তনও জরুরি। বর্তমান কর্মবাজারে শুধু একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করলেই চলবে না; এর পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের বড় দাবি। শিক্ষার্থীদের উচিত নিজেদের পড়াশোনার ক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন পেশাগত কোর্স, প্রশিক্ষণ বা সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল দক্ষতা এবং আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করলে কর্মবাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সম্ভব।
একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় কথা বলা ও লেখার দক্ষতা এবং পেশাগত যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক কর্মক্ষেত্রে শুধু কাজ জানাই যথেষ্ট নয়; নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা, দলগতভাবে কাজ করা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও নিয়োগদাতারা গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। তাই শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই এসব দক্ষতা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনও চাকরির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ইন্টার্নশিপ, ভলান্টিয়ারিং বা প্রকল্পভিত্তিক কাজে যুক্ত হওয়া শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। এতে তারা শুধু বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাই অর্জন করে না, বরং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও দায়িত্ব সম্পর্কে আগাম ধারণাও পায়। পাশাপাশি পেশাগত যোগাযোগ বা নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্বও এখন অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন পেশাজীবী, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক বা অনলাইন পেশাগত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যোগাযোগ তৈরি করলে চাকরির সুযোগ সম্পর্কে জানা এবং নিজেকে তুলে ধরার সুযোগও বাড়ে।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পেশাগত নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম LinkedIn–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা Ryan Roslanskyও এ বিষয়ে তরুণদের সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাপী চাকরির বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নিয়োগদাতারা এখন কেবল ডিগ্রির ওপর নির্ভর করছেন না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence–সম্পর্কিত জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নতুন কিছু দ্রুত শেখার মানসিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই কেবল নামী প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রির পেছনে না ছুটে বাস্তব দক্ষতা ও শেখার আগ্রহ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
তবে এই সমস্যার সমাধান শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করা, শিল্পখাতের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
এর পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানোও সময়ের দাবি। সমাজে এই শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা গেলে অনেক তরুণ দক্ষতাভিত্তিক পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং সহায়ক নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেরাই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। সমন্বিত এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ডিগ্রি ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং তরুণ সমাজের সম্ভাবনাও আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনার পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। সময়ের দাবি হলো—শিক্ষাকে বাস্তব দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং কর্মবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার, শিল্পখাত এবং তরুণদের নিজস্ব উদ্যোগ—এই সবকিছুর সমন্বয় ঘটাতে পারলেই পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
সব মিলিয়ে “ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই”—এই বাস্তবতা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মবাজারের মধ্যে বিদ্যমান বড় এক ব্যবধানের প্রতিফলন। বর্তমান সময়ে শুধু ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন ব্যবহারিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, ভালো যোগাযোগ ক্ষমতা এবং দ্রুত শেখার মানসিকতা। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ডিগ্রি আর বেকারত্বের এই বৈপরীত্য ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং তরুণ সমাজের সম্ভাবনাও বাস্তবে রূপ পাবে।

