বাংলাদেশে গ্যাস সংকট এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর ও শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের নিম্নচাপ, অনিয়মিত সরবরাহ এবং দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকার অভিযোগ প্রায় প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাসাবাড়িতে রান্না থেকে শুরু করে কারখানার উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল সরবরাহের সাময়িক ঘাটতির ফল নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি–এর দামের অস্থিরতা ও আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠে—বাংলাদেশে চলমান গ্যাস সংকটের প্রকৃত কারণ কোথায়? এটি কি কেবল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের প্রভাব, নাকি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল? বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্যাস সংকটের পেছনে বহুস্তরীয় কারণ ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার সমন্বয় আছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতে গভীরভাবে পড়েছে।
বাংলাদেশে গ্যাস সংকট কোনো নতুন সমস্যা নয়; দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি দেশের জ্বালানি খাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। সংকট নিরসনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েক দফায় গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে এবং বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর ফলে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে এবং অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় ও দেনার বোঝা বেড়েছে, তবু গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি বহুদিন ধরেই বিদ্যমান। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার ঐ বৎসরের ২১ এপ্রিল থেকে সারা দেশে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ৩ জানুয়ারি নতুন সংযোগ বিষয়ে যাচাই-বাছাই করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি সীমিত আকারে নতুন সংযোগ যাচাই-বাছাই করত: গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সুপারিশ করে। তবে সেই সময়ে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল। পরে ২০১৯ সালের ২১ মে জ্বালানি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে তিতাস গ্যাসের আওতায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়।
গ্যাস বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান জ্বালানি। বাসাবাড়িতে রান্না, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং পরিবহন খাত—সবখাতেই এর প্রয়োজন। সামান্য ঘাটতিও অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন কমবে না, তেমনি শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও ব্যাহত হবে। দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের আকারে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গ্যাস সরবরাহ অপরিহার্য।
তবে সংকটের পেছনে শুধু উৎপাদন ঘাটতি নয়; দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, পরিকল্পনার অভাব ও অপচয়ও বড় ভূমিকা রেখেছে। অনেক গ্যাসক্ষেত্র বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানও প্রয়োজনীয় গতি পায়নি। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে এলএনজি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ গ্যাস সংকটকে আরও জটিল করেছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি আমদানির খরচ বাড়িয়েছে। ২০০৯ সালে দুই চুলার গ্যাসের মাসিক বিল ছিল ৪৫০ টাকা; এটি পরবর্তীতে ১,০৮০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। শিল্প খাতে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৫.৮৬ টাকা থেকে ৩০ টাকায় উন্নীত করা হলেও ঘাটতি কাটেনি; বরং উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
শিল্প ও আবাসিক খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা, অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লসও সমস্যা বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ, অযথা ব্যবহারের প্রবণতা ও অপচয়—সব মিলিয়ে বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে। দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, তবে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ মাত্র ২৫০–২৭০ কোটি ঘনফুট। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০–১৩০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালি খাতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে ব্যবহৃত গ্যাসের ৪১% বিদ্যুৎকেন্দ্রে, ৩৬% শিল্প খাতে, ১১% গৃহস্থালি, ৬% সার উৎপাদনে, ৫% সিএনজি খাতে এবং ১% চা শিল্পে ব্যবহার হয়। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখতে অনেক সময় বিদ্যুৎ থেকে কমিয়ে সার বা সিএনজি খাতে সরবরাহ বাড়ানো হয়। মাহে রমজান উপলক্ষে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার সময় তিন ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ছয় ঘণ্টা করা হলেও রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংকট অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো, এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানে মোট ৪০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ থাকতে পারে, যার ২৮ বিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলনযোগ্য। শ্রীকাইল-৫ কূপে খনন কাজ ২৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ১ জানুয়ারি শেষ হয়েছে, ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। বাপেক্সের বিজয়-১০ রিগ ব্যবহার করে খনন করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছে।
সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে ১৮টি প্রকল্পের আওতায় ৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৬৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পর্যন্ত ২২টি কূপ থেকে ২২৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০৭ মিলিয়ন ঘনফুট ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে অপচয় রোধ, শক্তি-দক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের গ্যাস সংকট একটি জটিল, বহুস্তরীয় সমস্যা। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কূপ খনন ও সমুদ্রফিল্ড অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির পরিকল্পিত ব্যবহার, সাশ্রয়ী ব্যবহারের নীতি এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসার—সব মিলিয়ে এগুলোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল চাবিকাঠি। কুমিল্লার মুরাদনগরের শ্রীকাইল ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র কার্যকরভাবে কাজে লাগালে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি কমানো সম্ভব, যা দেশের অর্থনীতি, শিল্প ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

