বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না, ফলে মেধা ও জ্ঞানের যথাযথ ব্যবহারও হচ্ছে না। এই বাস্তবতায় প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ইউনেস্কো–এর ‘গ্লোবাল ফ্লো অফ টেরিটরি – লেবেল স্টুডেন্টস’ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে ৪৯ হাজার ১৫১ জন শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে গেছেন।
শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, প্রবণতার দিক থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ইউথ লিডারশিপ সেন্টার এবং ব্রাক ইউনিভার্সিটি– ‘ইউথ মেটার’স সার্ভে -২০২৩’ শীর্ষক সমীক্ষা অনুযায়ী, শিক্ষিত তরুণদের প্রায় ৪২ শতাংশ দেশ ছাড়তে আগ্রহী। আটটি বিভাগের ৫ হাজার ৬০৯ জন তরুণ-তরুণীর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণ তাদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ মনে করছেন। একই সঙ্গে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করেন, দেশে তাদের দক্ষতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ নেই।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সীমান্ত আর আগের মতো কঠিন নয়; প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহের সহজলভ্যতা তরুণদের সামনে অগণিত সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা—কর্মসংস্থানের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অদৃশ্য অনিশ্চয়তা—তাদের বিদেশমুখী হওয়াকে প্রভাবিত করছে।
দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে, অথচ পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের সুযোগ সীমিত। পড়াশোনা শেষ করার পরও অনেকেই সময়মতো চাকরি পান না, আর যারা পান, তাদের আয় জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে যথেষ্ট নয়। ফলে একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় তরুণরা বিদেশমুখী হচ্ছেন।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশগমনের প্রবণতা কেবল বাড়ছেই না, এর ধরণেও এসেছে পরিবর্তন। আগে যেখানে বিদেশে পড়াশোনা বা কাজের জন্য যাওয়া মূলত নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণীরাও ক্রমেই এগিয়ে আসছেন। বিশেষ করে অনেক তরুণী বিয়ের আগেই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাচ্ছেন, যা সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
বিদেশমুখী আগ্রহও কম নয়। ব্রিটিশ কাউন্সিল –এর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী বিদেশে যেতে আগ্রহী। ২০২৫ সালের আগস্টে রেকর্ড সংখ্যক ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৫ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। তবে বিদেশগমন করা শ্রমিকদের অনেকেই এখনো অদক্ষ, ফলে তারা তুলনামূলক কম আয় করতে সক্ষম হচ্ছেন। এর ফলে দেশ দক্ষ জনশক্তি হারাচ্ছে এবং প্রত্যাশিত হারে রেমিট্যান্স আসছে না, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা এখন এক বাস্তবতা, যার পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত, মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে যারা জ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তারা উন্নত শিক্ষা খোঁজে দেশের বাইরে যাচ্ছেন।
এছাড়া কর্মসংস্থানের সংকটও বড় ভূমিকা রাখছে। পড়াশোনা শেষ করার পর যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়া, দীর্ঘদিন বেকার থাকা কিংবা স্বল্প আয় নিয়ে জীবনযাপন—এসব বাস্তবতা তরুণদের হতাশ করছে। দেশের চাকরির পরিমাণ ও বেতন অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই তরুণরা মনে করেন, একই পরিশ্রমে বিদেশে গেলে তারা আরও ভালো জীবনযাপন করতে পারবেন।
উন্নত জীবনমান, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার আকর্ষণও তাদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাও এই প্রবণতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ। মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তরুণদের দেশে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে অনেকেই আস্থাহীন হয়ে পড়েন, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি বা প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
এই পরিস্থিতি “ব্রেইন ড্রেইন” বা মেধাপাচারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দেশের সম্ভাবনাময় তরুণরা বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ছেন, কিন্তু সেই মেধা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগছে না। একসময় যাদের দেশ গড়ার শক্তি হিসেবে দেখা হতো, তাদের একটি বড় অংশ এখন বিদেশেই স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, এবং তাদের অনেকেই দেশে ফিরতে আগ্রহী নন।
অন্য একটি বড় কারণ হলো উন্নত জীবনযাত্রার আকাঙ্ক্ষা। বিদেশে পেশাগত নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা—সব মিলিয়ে সুশৃঙ্খল জীবনের প্রতিশ্রুতি তরুণদের আকৃষ্ট করছে। তারা বিশ্বাস করে, সেখানে নিজেদের সম্ভাবনাকে আরও ভালোভাবে বিকশিত করা সম্ভব। যদিও নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে গিয়ে মানসিক চাপের মুখেও পড়তে হয়, তবুও অনেকেই সফল হয়ে নিজেদের ও পরিবারের অবস্থার উন্নতি ঘটাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, বিদেশমুখী হওয়া এখন আর কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; এটি দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামোর সম্মিলিত প্রভাবের ফল। তাই এই প্রবণতাকে বোঝার জন্য শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যাবশ্যক।
তরুণ-তরুণীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে হলে সমস্যার মূল জায়গাগুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী করে তোলা জরুরি। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বাজারচাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে পড়াশোনা শেষ করেই তারা কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে।
এর পাশাপাশি দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে উদ্যোগ বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে আইটি, ফ্রিল্যান্সিং, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সৃজনশীল খাতে তরুণদের সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশেই একটি শক্তিশালী কর্মবাজার তৈরি সম্ভব।
নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাবমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, যাতে তরুণরা বিশ্বাস করতে পারে—তাদের মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে। এই আস্থার অভাবই অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিদেশমুখী করে তোলে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যখন তারা মনে করবে দেশে থেকেই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়া সম্ভব, তখন বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও সময়ের দাবি। সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করলে অনেক তরুণ চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতা হয়ে উঠতে পারে। স্টার্টআপ সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনীতিও গতিশীল হবে।
সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তরুণদের জন্য দেশে একটি ইতিবাচক, সম্ভাবনাময় এবং টেকসই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা তৈরি করা। তারা যেন অনুভব করে, নিজেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য বিদেশই একমাত্র পথ নয়। বরং দেশেই রয়েছে সম্ভাবনা, সম্মান ও সফলতার সুযোগ—এই বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারলেই মেধাপাচার কমবে এবং দেশের উন্নয়নে তরুণদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের বাস্তব সংকট ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। উন্নত শিক্ষা, ভালো চাকরি, নিরাপদ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার খোঁজে তারা দেশ ছাড়ছেন। তবে সমস্যার মূল দিকে নজর দিয়ে কার্যকর সমাধান করা যায়। মানসম্মত শিক্ষা, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করলে বিদেশগমন কমবে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার তরুণ প্রজন্ম—তাদের ধরে রাখতে পারলেই টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

