বাংলাদেশে পুলিশ সংস্থা বহু বছর ধরেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল বাহিনী হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের হ্রাস, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অপরাধ দমন ব্যবস্থার অকার্যকারিতা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যেখানে পুলিশ হওয়া উচিত জনগণের নিরাপত্তা এবং ন্যায়ের সুরক্ষা নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে, সেখানে অনেক সময়ই এটি ভয় প্রদর্শনকারী বাহিনী হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশ সংস্কারের দাবি শুধু সময়ের প্রয়োজন নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও একান্ত জরুরি। আধুনিক, পেশাদার এবং জনকল্যাণমুখী পুলিশ বাহিনী গঠন ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার রক্ষা এবং জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন সম্ভব নয়।
সম্প্রতি সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একশত দশ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে পুলিশ বাহিনীর তেরটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া বাহিনীকে আরও কার্যকর এবং জনগণমুখী করতে ২২টি আইনের সংশোধন ও পরিমার্জনের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পুলিশ বাহিনী ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি আইন, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এবং ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশন অনুযায়ী কাজ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বিশ্বে জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যেসব প্রযুক্তিগত কৌশল প্রয়োগ করা হয়, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে পাঁচ ধাপে বল প্রয়োগের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই ধাপগুলো জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং প্রাণহানির ঝুঁকি এড়িয়ে চলা যায়।
পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার রক্ষা করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য পুলিশ সংস্কার অপরিহার্য। কমিশন আশা করছে, রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গঠন, আইনি কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং বাহিনীর ভেতরের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন করা। বছরের পর বছর ধরে হারানো এই আস্থা ফিরিয়ে এনে পুলিশকে একটি জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি।
মানবাধিকার রক্ষাও এই সংস্কারের অপরিহার্য অংশ। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা এবং আইনশৃঙ্খলার নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষী সদস্যদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার অন্যতম মাধ্যম।
আজকের যুগে অপরাধের ধরনও বদলে গেছে। সাইবার অপরাধ এবং আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম, প্রশিক্ষিত এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী পুলিশ বাহিনী গঠন করা অপরিহার্য। পুলিশের সেবার মান উন্নয়ন করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে এবং নিরাপদে প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ পার করছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং সেই সূত্র ধরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়ে গেছে যে, পরিবর্তনকে আর দীর্ঘ সময় ধরে থামানো সম্ভব নয়। সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এই পরিবর্তনের প্রমাণ বহন করে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কীভাবে এই পুলিশ সংস্কারকে অর্থবহ, টেকসই এবং জনগণ ও পুলিশের মধ্যে আস্থা পুনঃস্থাপনের কাজে রূপান্তরিত করতে পারি।
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক, পেশাদার এবং দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক যুগের পুলিশ আইন থেকে সরে আসা অপরিহার্য। সেই আইন মূলত নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সেবাকে নয়। ২০০৭ এবং ২০১৩ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় নতুন পুলিশ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। এতে গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব পুলিশিং, স্বাধীন পুলিশ কমিশন, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ এবং জনসাধারণের পক্ষ থেকে তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে এগুলো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ বাহিনীতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাধীন পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে, যা ৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এই কমিশন পুলিশে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক বিষয়ে তদারকি করবে এবং নাগরিকদের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বও পালন করবে। এটি শুধু বাহ্যিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং পুলিশকে জনবান্ধব ও দায়বদ্ধ একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
সরকার পুলিশ সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বাধীন পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এর পাশাপাশি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া তৈরির যেখানে বিশেষভাবে জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংস্কারের অংশ হিসেবে পুলিশের প্রশিক্ষণে মানবাধিকার এবং পেশাগত আচরণ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে পুরোনো মানসিকতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বর্তমান সংস্কারের মূল লক্ষ্য শুধু পুলিশের পোশাক বা বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, বরং তাদের কাজে এবং মানসিকতায় যথাযথ পরিবর্তন আনা।
অধ্যাদেশটি সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠনের ব্যবস্থা করেছে। কমিশন পুলিশ প্রধান (IGP) নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে, নাগরিক অভিযোগ অনুসন্ধান করবে এবং পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সংঘাত ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে, এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কমিয়ে পুলিশ বাহিনীর ওপর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করবে। মানবাধিকার রক্ষা এবং প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুলিশকে একটি সেবামূলক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
একটি নতুন আইন প্রণয়ন হলে পুলিশ বাহিনীকে টেকসই, দায়বদ্ধ এবং দক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এটি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করবে, ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক দৃঢ় করবে। সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান এবং জনগণের আন্দোলনের সৃষ্ট স্ফুলিঙ্গ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যা ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে এসেছে।
দুর্ভাগ্যবশত, অতিরিক্ত বল প্রয়োগ এবং অনিয়মের কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বহু বছর ধরে পুলিশকে জনগণের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পুলিশ প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হওয়ায় জনগণের আস্থা ক্রমেই ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তারের অভিযোগে এই অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে।
এতে দেখা যায়, কাজের অতিরিক্ত চাপ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও রিসোর্সের অভাবের কারণে পুলিশ সদস্যরাও কখনও সহিংসতার শিকার হয়ে নিজেদেরই ভুক্তভোগীর অবস্থায় পান। এই সংকটগুলো বাহিনীর কার্যকারিতা এবং মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা ২০২৪ সালের আগস্টে পুলিশ সদস্যদের উত্থাপিত ১১ দফা দাবিতেও স্পষ্ট হয়েছিল। তবুও প্রতিটি সংকটের সঙ্গে নতুন সুযোগও জন্ম নেয়। সাম্প্রতিক পুলিশ সংস্কার কমিশনের গঠন বর্তমান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যা বাংলাদেশের পুলিশকে আধুনিক, জনকল্যাণমুখী এবং দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
পুলিশ সংস্কারের মাধ্যমে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়, বরং জনগণের সেবাদানকারী একটি জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও পেশাদার পুলিশ গড়ে তোলা সম্ভব। পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন, আইন ও শৃঙ্খলার আধুনিকায়ন, মানবাধিকার রক্ষা এবং দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার জন্য এটি অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা এবং জনগণের সঙ্গে আস্থা পুনঃস্থাপনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে পুলিশ সংস্কার দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যত এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবে।

