রাষ্ট্রের তিনটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে বিচার বিভাগই নাগরিকদের শেষ আশ্রয়স্থল। সংবিধান বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখার অঙ্গীকার করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি নানা কাঠামোগত দুর্বলতা, মামলাজট, বিচার বিলম্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সংকটাপন্ন।
দেশজুড়ে বিচারপ্রার্থী মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে যেখানে দ্রুততা ও দক্ষতা অগ্রাধিকার পাচ্ছে, সেখানে বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি করছে।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ বর্তমানে একাধিক গভীর সংকটের মুখোমুখি, যা সরাসরি ন্যায়বিচার এবং জনগণের আস্থাকে প্রভাবিত করছে। দেশের বিভিন্ন আদালতে বিপুল সংখ্যক মামলা বছরের পর বছর নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে বিচারপ্রার্থীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ন্যায়বিচার পান না, যা বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
অবকাঠামোগত সংকটও সমস্যা জটিল করে তুলেছে। প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত বিচারক নেই এবং অনেক আদালতে প্রয়োজনীয় কক্ষ বা আধুনিক সুবিধার অভাব রয়েছে। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো এখনও সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়; এটি অনেকাংশে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে।
বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাবও দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগের বিষয়। রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বিচারের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এছাড়া কার্যকর নজরদারি বা জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা সৃষ্টি করছে, যা সাধারণ মানুষের আস্থার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করছে। সব মিলিয়ে কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক নির্ভরতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘসূত্রতা—এই চারটি উপাদান বিচার বিভাগের সংকটকে আরও গভীর করেছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, যুগোপযোগী এবং কার্যকর সংস্কার।
বিচার বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া পদক্ষেপগুলো আশা জাগাচ্ছে। ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বাধীনতা জোরদার করেছে। ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে অধস্তন আদালতের ওপর সুপ্রিম কোর্টের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর বিচার ব্যবস্থার অগ্রগতি লক্ষ্যণীয়। ভার্চুয়াল কোর্ট, পেপারলেস ফ্যামিলি কোর্ট এবং ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট চালু করে মামলার জট কমানো হচ্ছে। আইনি কাঠামো আধুনিক করার অংশ হিসেবে সাইবার নিরাপত্তা আইন পুনর্বিন্যাস এবং ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালে AI-ভিত্তিক আইনি সেবা চালু হয়েছে। মার্চে ‘FindmyAdvocate’ প্ল্যাটফর্ম নাগরিকদের সমস্যা অনুযায়ী আইনজীবীর পরামর্শ দেয় এবং ২৪ ঘণ্টা সচল AI লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট যুক্ত রয়েছে। ‘Ukil.Ai’ নামের বেসরকারি উদ্যোগ তাৎক্ষণিক আইনি নির্দেশনা, ডকুমেন্ট সহায়তা এবং মামলার প্রাথমিক ধারণা প্রদান করছে।
সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে, যার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের সব প্রশাসনিক ও সচিবালয় সম্পর্কিত দায়িত্ব নতুন এই প্রতিষ্ঠানটির হাতে অর্পিত হয়েছে। এ সচিবালয়ই এখন থেকে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করবে, যাতে বিচার বিভাগ আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ডিজিটাল লিগ্যাল এইড কার্যক্রমও বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও UNDP যৌথভাবে NLASO প্রকল্প চালাচ্ছে, যেখানে অনলাইন টুল, ভার্চুয়াল মধ্যস্থতা ও ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের ৮টি পাইলট জেলায় ‘স্মার্ট লিগ্যাল এইড’ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিচারিক সেবা আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও জনবান্ধব করার চেষ্টা চলছে। সরকারি উদ্যোগের মধ্যে BD Legal Aid App এবং টোল-ফ্রি হেল্পলাইন (১৬৪৩০) নাগরিকদের ঘরে বসে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে। এইসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারকে আরও সহজলভ্য করছে এবং আদালতের মামলার জট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি সম্পূর্ণ আলাদা সচিবালয় প্রয়োজন, যাতে প্রশাসনিক ও অর্থায়ন সম্পূর্ণ বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিচারক নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ, নতুন আদালত স্থাপন এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা আদালতের কার্যকারিতা বাড়াবে।
মামলাজট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (ADR), গ্রাম আদালত এবং স্থানীয় সালিশ প্রসারিত করা যেতে পারে। ভার্চুয়াল কোর্ট, ই-ফাইলিং ও ডিজিটাল কেস ট্র্যাকিং চালু করলে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য হবে।
বিচারকদের জবাবদিহিতা, প্রশিক্ষণ এবং নৈতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করা, পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রসিকিউশন ও তদন্ত ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার বানানো হলে পুরো বিচার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।
সমন্বিতভাবে এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে বিচার বিভাগ কেবল আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নয়, মানুষের আস্থা ও অধিকার রক্ষাকারী শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সাধারণ মানুষ পাবে দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার, যা দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনকে আরও দৃঢ় করবে।
বিচার বিভাগ দেশের নাগরিকদের শেষ আশ্রয়স্থল। দীর্ঘসূত্রতা, অবকাঠামো সংকট, প্রশাসনিক নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে সাম্প্রতিক সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার আশা জাগছে। স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে বিচার বিভাগ কেবল আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নয়, মানুষের আস্থা ও অধিকার রক্ষাকারী শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

