বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা এখন একটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। অবকাঠামো, রপ্তানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রগতি সত্ত্বেও মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়াতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আইনের শাসনকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। উন্নয়ন কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন নয়; এটি ন্যায়বিচার, পূর্বানুমানযোগ্য নীতিকাঠামো এবং কার্যকর জবাবদিহির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators-এ “Rule of Law” সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও মাঝামাঝি পর্যায়ে। World Justice Project Rule of Law Index 2023-এ দেশটি ১৪০টির বেশি দেশের মধ্যে নিম্নার্ধে রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের Corruption Perceptions Index 2023-এ বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ২৪। এসব সূচক কেবল পরিসংখ্যান নয়; এগুলো বিনিয়োগ আস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিচারব্যবস্থার চাপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখের বেশি। নিম্ন আদালতগুলোতে মামলার সিংহভাগ জমে থাকায় বিচারপ্রাপ্তিতে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্ববর্তী Doing Business প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি বাস্তবায়নে গড়ে ১,৪০০ দিনের বেশি সময় লাগে।
এই দীর্ঘসূত্রিতা শুধু ন্যায়বিচার বিলম্বিত করে না; এটি ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ায়, অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে চুক্তি বাস্তবায়ন দ্রুত ও নিরপেক্ষ, সেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০৩১ ও ২০৪১ সালের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রেক্ষাপটে এটি একটি কৌশলগত বিবেচ্য বিষয়।
নীতিগত অগ্রাধিকার ও সংস্কার রূপরেখা
আইনের শাসন শক্তিশালী করতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট ও ই-জুডিশিয়ারি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) সম্প্রসারণ এবং বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত গঠন বিচারব্যবস্থার চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি বিচারক ও আদালতকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়ন সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং অভিযোগ তদন্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও নাগরিক আস্থা বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। বৈশ্বিক বাস্তবতায় সুশাসন এখন অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ; ফলে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন গঠিত সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত মুহূর্ত। উন্নয়ন অভিযাত্রার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আইনের শাসন সংস্কারের অগ্রভাগে রাখতে হবে। সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, বিচারব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। নতুন সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে—অর্থনৈতিক সাফল্যকে প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তায় রূপান্তর করার, যাতে উন্নয়ন কেবল সংখ্যায় নয়, ন্যায়ভিত্তিক শাসনের ভিতেও প্রতিফলিত হয়।

