তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আদালতের সাম্প্রতিক রায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জবাবদিহি এবং গণভোটের প্রশ্ন ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন রিদওয়ানুল হক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংবিধান, সাংবিধানিক আইন ও বিচারিক সক্রিয়তা নিয়ে তাঁর লেখা ও সম্পাদিত বই বের হয়েছে দেশের বাইরের বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আপিল বিভাগের দেওয়া একটি রায়ে বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে। আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক গবেষণাধর্মী লেখা লিখেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার এই বিধান আদালতের রায়ে একবার বাতিল হওয়া, আরেকবার ফিরে আসা—এ বিষয়কে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
রিদওয়ানুল হক: ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটা ছিল একটা রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল। সেই সময়ের পটভূমিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল একটি বড় ধরনের ইনোভেশন। কারণ, ওই সময় অন্য কোনো দেশের সংবিধানে এ রকম কোনো সরকারব্যবস্থা ছিল না।
যাহোক, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনটি ভালোভাবেই হয়। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনটাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়। সেবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এরপর পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০০৬ সালে, সেটা ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে হয়। এভাবে পরপর তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছিল। এ নির্বাচনগুলো মোটাদাগে ছিল সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এরই মধ্যে ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি এক সংক্ষিপ্ত আদেশে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। মহাজোট সরকার এরপর ওই রায়ের বরাত দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর কলেবর অনেক বড়। কিন্তু মূল বিষয় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা। এরপর দলীয় সরকারের অধীনে পরপর তিনটা নির্বাচন হয় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে। এ তিনটা নির্বাচনই ছিল এককথায় বিতর্কিত ও জালিয়াতির নির্বাচন। নির্বাচনের নামে এ রকম প্রহসন করেই স্বৈরাচারী সরকার তার ক্ষমতা ধরে রেখেছিল।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে দেশে একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আপিল বিভাগে একটি রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হয়। সেই রিভিউ পিটিশন গ্রহণ করে আপিল বিভাগের দেওয়া আগের রায় বাতিল করা হয়। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলো।
এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। একটি হলো আদালত বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, নতুন করে সংবিধান সংশোধন করতে হবে না। কিন্তু আমি মনে করি, বিষয়টি নিয়ে আগামী জাতীয় সংসদে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। ১৯৯৬ সালের চেয়ে এখনকার পটভূমি অনেকটা আলাদা। নতুন পটভূমিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। সংসদে আলোচনার মাধ্যমে আইনপ্রণেতারা ভবিষ্যতে সেটা করবেন বলে প্রত্যাশা রইল।
দ্বিতীয় বিষয়টা হলো আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে না। এটা প্রসপেক্টটিভলি বা ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট সময় থেকে কার্যকর হবে। আদালত বলেছেন, আগামী সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই হবে। পরবর্তী নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়েই আদালতের এ রকম সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হলে এখন নতুন জটিলতা ও সমস্যা তৈরি হতো। আদালত হয়তো সেই জটিলতা ও সমস্যার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন।
প্রশ্ন: তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হওয়ার পর দেশ গণতন্ত্রের মহাসড়কে হাঁটবে বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। অতীতে বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে নানাভাবে ম্যানিপুলেট করার অভিযোগ উঠেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেই কি গণতন্ত্র আসবে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু হবে—আমরা কি এটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি?
রিদওয়ানুল হক: তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ের আমি সমালোচনা করেছিলাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে তাঁরা অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক বলেছিলেন। আমার বক্তব্য ছিল, শুধু তাত্ত্বিকভাবে নয়, গণতন্ত্রকে বুঝতে হবে একটি দেশের সামগ্রিক পটভূমি থেকেও। রাজনৈতিক দলগুলোর একধরনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল এবং এই ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু হয়েছিল। এ কারণেই এটা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হবে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু অতিরিক্ত আশাবাদ ব্যক্ত করা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাংলাদেশের পটভূমিতে ডেফিনেটলি গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক। কিন্তু এটা নির্ভর করবে আসলে কীভাবে সেটা কার্যকর হবে তার ওপর।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এখন যেভাবে আছে, সেটার কিছু ত্রুটি বা সমস্যা কিন্তু এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। সবচেয়ে বড় ত্রুটিটা হলো সর্বশেষ প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিধানটি। অতীতে একবার এটা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল এবং তারই ফলে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। সেই সরকার তিন মাসের পরিবর্তে দুই বছর ক্ষমতায় থেকেছিল।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝেছি, সর্বশেষ প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিধানটি বিচার বিভাগকে রাজনৈতিকীকরণের বিতর্কের মুখে ফেলে দিয়েছিল। বিদ্যমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার এটা একটা জেনেটিক ডিফেক্ট বা জন্মগত ত্রুটি বলা যায়। বিচার বিভাগকে বা বিচারপতিদের যত দূর সম্ভব রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে ফেললে তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচারপতিদের এ ধরনের সরকারব্যবস্থায় যুক্ত করার পক্ষে নই। এ কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপ্রণালি নিয়ে পরবর্তী সংসদে এবং সংসদের বাইরে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হওয়া দরকার।
প্রশ্ন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকার তো অনির্বাচিত সরকার। বর্তমানে বেশ কিছু ইস্যুতে এ ধরনের সরকারের এখতিয়ার বা কাজের পরিধি এবং তাদের জবাবদিহি নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
রিদওয়ানুল হক: নির্বাচিত হোক কিংবা অনির্বাচিত হোক—সব ধরনের সরকারেরই একটা জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত সরকার হলেও তাদেরকে রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারকে এ বিষয়ে তেমন কোনো কথাবার্তা বলতে শোনা যায়নি বা জবাবদিহির কোনো মেকানিজম তৈরি করা হয়েছে জানা যায়নি। অ্যাকাউন্টেবিলিটির দিক থেকে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সরকার সেগুলো অতিক্রম করতে পারছে না এবং এই পরীক্ষায় সরকার বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
বর্তমান পটভূমিকে বিবেচনায় নিয়ে একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে প্রায় হুবহু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে বা অনুসরণে। সেই হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার হওয়ার কথা নির্দলীয় এবং সেই সরকারে থাকা কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের থাকা দু-একজন উপদেষ্টার আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে। এটা অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতাকে দারুণভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে তাঁরা পদত্যাগ করবেন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। কিন্তু তাঁরা তো এখন সরকারে থেকে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন এবং ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারছেন। এটা যেমন স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করছে, তেমনি নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। চারটি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে ভোটারদের মতামত জানাতে হবে। এ বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?
রিদওয়ানুল হক: গণভোটের ক্ষেত্রে চারটি প্রশ্নের একটি উত্তর দেওয়া আসলে খুবই অস্বাভাবিক বিষয়। জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটাতে জনগণের আগ্রহ এমনিতেই কম থাকবে। তার ওপর যদি প্রশ্ন নিয়ে এ রকম বিভ্রান্তি থাকে, তাহলে গণভোট নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এ জন্য গণভোটের প্রশ্নগুলোকে শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নে নিয়ে আসতে হবে। গণভোটের প্রশ্ন যদি অস্পষ্ট থাকে এবং জনগণের কাছে বার্তাটা যদি ঠিকভাবে না পৌঁছায়, তাহলে যে উদ্দেশ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা ব্যর্থ হতে পারে।
- সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনাকে ধন্যবাদ।
- রিদওয়ানুল হক: আপনাকেও ধন্যবাদ।
প্রথম আলোর সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -মনজুরুল ইসলাম

