বাংলাদেশের একটি গ্রামের কয়েকজন মানুষ তাদের এক বৃদ্ধ ইমামের পেছনে ১৯ মার্চ ২০২৬ বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন। তারা আফগান ইসলামী সরকারের অনুসরণে রোজাও শুরু করেছিলেন। সে হিসাবে সেদিন তাদের ২৯ রোজা পূর্ণ হয়েছে।
বিশ্বের আরো ২/১টি দেশেও এদিন ঈদ পালিত হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে ১৪৪৭ হিজরি সনের শাওয়াল মাসের চাঁদ দৃশ্যমান হয়েছে।
এতে বড় কোনো সমস্যা হয়নি। যদি আরও কিছু লোক আফগান ইসলামী সরকারের শরিয়াহ শাসনব্যবস্থাকে কর্তৃপক্ষ হিসেবে মেনে অনুসরণ করে, তাহলে এটিও একটি পন্থা। আর যারা সৌদি আরবের অনুসরণ করেন, তাদেরও যদি রোজা ২৯-এর কম না হয়, তাহলে তারাও ২০ মার্চ শুক্রবার ঈদুল ফিতর পালন করতে পারেন। ঢাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে কিছু লোক এভাবে একদিন আগে ঈদের জামাত আদায় করেছেন। এটিও আরেকটি পন্থা।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় একথা সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে যে, বৃহত্তর মুসলিম সমাজের মূলধারার সঙ্গে একীভূত হয়ে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সব মানুষ একই তারিখে রোজা ও ঈদের দিন পালন করা শরিয়তে কাঙ্ক্ষিত বিষয়। এর ব্যতিক্রম ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসনীয় বা অনুকরণীয় পথ ও পদ্ধতি নয়।
বাকি বাংলাদেশের আকাশে ১৯ মার্চ ২০২৬ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা না যাওয়ায় ৩০ রোজা পূর্ণ হয়ে ২১ মার্চ শনিবার ঈদুল ফিতর পালন করা হবে। এটি শরিয়তের বিধানের সর্বাধিক সঠিক পরিপালন এবং উলামায়ে কেরামের নির্দেশনার আলোকে সরকারের বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
ঈদের দিন নিয়ে মতানৈক্যের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় সবার লক্ষ্য রাখা উচিত—
১. যেন কোনো এলাকার রোজা ২৯ বা ৩০-এর কম-বেশি না হয়।
২. সমাজে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও অশান্তি সৃষ্টি না করা এবং একদল মানুষ নিজেদের পছন্দ অন্যদের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া; পাশাপাশি অন্যদের রোজা হয়নি বা ঈদের দিন রোজা হচ্ছে—এমন মাসআলা তুলে দোষারোপ না করা।
৩. অধিকাংশ মানুষ শরিয়তসমর্থিত যে রীতি ও শৃঙ্খলা অনুসরণ করে, তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ক্ষুদ্র অংশের ঈদ ও রোজা যেন বৃহত্তর মুসলিম সমাজের বিপরীতে অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতার কারণ না হয়।
চাঁদ যেদিন পৃথিবীতে দৃশ্যমান হবে, প্রযুক্তির ব্যবহারে তা নির্ণয় করে সেদিনই সারা বিশ্বে একই তারিখে ঈদ বা রোজা করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা ইসলাম দেয়নি। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে চাঁদের সংবাদ পাওয়া সত্ত্বেও মক্কা, মদিনা, শাম, কুফা ও বসরায় একই দিনে রমজান বা ঈদ পালন করা হয়নি। বরং প্রতিটি এলাকায় নিজেদের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে রোজা ও ঈদ পালন করা হয়েছে।
পরবর্তীতে খিলাফতের যুগে একটি প্রশাসনিক এলাকার চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে বৃহত্তর অঞ্চলেও রোজা ও ঈদ পালন করা হয়েছে। যেমন বাংলাদেশসহ ছোট আয়তনের বহু দেশে এক জায়গায় চাঁদ দেখা গেলে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সারা দেশে রোজা ও ঈদের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। শরিয়ত এমন ব্যবস্থার অনুমোদন দেয়। আবার শরিয়তসম্মত পন্থায় একই প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে ভিন্ন দিনেও রোজা ও ঈদ পালনের নজির রয়েছে।
যেমন একটি রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে ঈদ হলেও তৎকালীন পূর্ব অংশে ঈদ পালন করা হয়নি। ভারতে প্রায়ই দুই দিনে সারাদেশে ঈদ পালিত হয়। আমি নিজেও দিল্লিতে ২৯ রোজার ঈদ পালনের পরদিন লখনৌতে ৩০ রোজা পূর্ণ করা মুসলমানদের সঙ্গে একই ঈদ পালন করেছি। সৌদি আরব ও বাংলাদেশে ভিন্ন তারিখে রোজা ও ঈদ পালনের অভিজ্ঞতাও হয়েছে।
আফগানিস্তানে ঈদ পালন হলেও ইরান ও পাকিস্তানে একই দিনে ঈদ পালন হয় না। তারা নিজ নিজ দিগন্তে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রোজা ও ঈদ পালন করে। এ বিষয়ে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এক ধরনের; আফ্রিকা, সৌদি আরব, আমিরাত, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই আরেক ধরনের; ওমান, কাতার, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ভিন্ন ধরনের। এটি চাঁদের উদয় ও দৃশ্যমান হওয়ার সময়গত পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট স্বাভাবিক ভিন্নতা।
সারা বিশ্বে একই দিনে ঈদ ও রোজা করা শরিয়তে আবশ্যিক বা অপরিহার্য কোনো বিষয় নয়। ২৯ বা ৩০ রোজার মূলনীতির ভিত্তিতে নিজ নিজ অঞ্চলের চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রোজা ও ঈদের দিন নির্ধারিত হয়। এতে কোনো সমস্যা নেই।
সারা দুনিয়ায় একই দিনে ঈদ ও রোজা করার কোনো বিশেষ গুরুত্ব বা ফজিলত ইসলামে স্বীকৃত নয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি এবং এ ধরনের কোনো ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেননি।

