চলতি বছরের পবিত্র হজ মৌসুম সামনে রেখে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। হজযাত্রী পরিবহনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বিমান ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, এ বছর তারা নিজস্ব উড়োজাহাজ ব্যবহার করেই হজ ফ্লাইট পরিচালনা করবে। হজ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে আধুনিক বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ। চলতি বছর মোট হজযাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৮ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ২০০ জন হজযাত্রী পরিবহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং বাকি অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনস সাউদিয়া।
বিমান সূত্র জানায়, প্রি-হজ ফ্লাইট চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত। এরপর ফিরতি হজ ফ্লাইট শুরু হবে ৩০ মে থেকে, যা চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকেও হজযাত্রী পরিবহন করা হবে। সব মিলিয়ে ১০৮টি ফ্লাইটে হজযাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে।
হজ ফ্লাইট নির্বিঘ্নভাবে পরিচালনার জন্য কিছু আন্তর্জাতিক রুটে সাময়িক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইট আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে, যা আগেই ঘোষণা দিয়েছিল বিমান। পাশাপাশি উড়োজাহাজ সংকটের কারণে কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট রিসিডিউল করা হচ্ছে, যাতে হজ কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
তবে এবার হজ ফ্লাইট থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আর্থিকভাবে লাভজনক অবস্থানে থাকবে বলে আশাবাদী কর্তৃপক্ষ। কারণ, ঢাকা-জেদ্দা রুটে হজযাত্রীদের পাশাপাশি নিয়মিত যাত্রীও পরিবহন করা হবে। মোট ফ্লাইটের মাত্র ৫ শতাংশ থাকবে সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড হজ ফ্লাইট। এর পাশাপাশি ২০২৬ সালের জন্য হজযাত্রীপ্রতি বিমান ভাড়া কমানো হয়েছে ১২ হাজার ৯৯০ টাকা।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যাবেন পাঁচ হাজার জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করবেন ৭৩ হাজার ৫০০ জন।
এদিকে ধর্ম মন্ত্রণালয় হজ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সৌদি সরকারের নীতিমালা এবং হজ প্যাকেজ ও গাইডলাইন-২০২৬ শতভাগ অনুসরণ করতে হবে হজ এজেন্সি ও এয়ারলাইনসগুলোকে। এ বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ সফিউজ্জামান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত চিঠি ইতোমধ্যে হজ এজেন্সির মালিক ও হজযাত্রী পরিবহনকারী তিনটি এয়ারলাইনসের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের হজ ফ্লাইট ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হবে। সৌদি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, একই সার্ভিস কোম্পানির আওতাধীন হজযাত্রীদের একই ফ্লাইটে সৌদি আরবে পাঠাতে হবে। প্রতিটি হজ এজেন্সিকে মোট যাত্রীর কমপক্ষে ২০ শতাংশ প্রি-হজ ফ্লাইটের মধ্যবর্তী পর্যায়ে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি প্রথম ও শেষ পর্যায়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ যাত্রী পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই সীমার বাইরে টিকিট ইস্যু করা যাবে না।
সরকারি হজ প্যাকেজের বিস্তারিত
এ বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় তিনটি হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে—হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ), হজ প্যাকেজ-২ এবং হজ প্যাকেজ-৩।
হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ)
এই প্যাকেজে হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরিফের সর্বোচ্চ ৭০০ মিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মারকাজিয়া বা সেন্ট্রাল এরিয়ায় আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। অ্যাটাচড বাথরুমসহ এক রুমে সর্বোচ্চ পাঁচজন থাকতে পারবেন। মিনায় তাঁবুর অবস্থান থাকবে জোন-২-এ। এই প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯০ হাজার ৫৯৭ টাকা।
হজ প্যাকেজ-২
এ প্যাকেজের অধীনে মক্কায় হারাম শরিফের ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৮ কিলোমিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মারকাজিয়া এলাকায় আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। এক রুমে সর্বোচ্চ ছয়জন থাকার সুযোগ থাকবে। মিনায় তাঁবুর অবস্থান থাকবে জোন-২-এ। এই প্যাকেজের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮১ টাকা।
প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-২-এর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ সাপেক্ষে দুই ও তিন সিটের রুম আপগ্রেডেশন এবং শর্ট প্যাকেজ সুবিধা নেওয়া যাবে। সাধারণ প্যাকেজে হজযাত্রীদের সৌদি আরবে অবস্থানকাল হবে ৩৫ থেকে ৪৭ দিন। শর্ট প্যাকেজে এই সময়সীমা কমে ২২ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়াবে।
হজ প্যাকেজ-৩ (সাশ্রয়ী)
এই প্যাকেজে মক্কায় আজিজিয়া এলাকায় এবং মদিনায় মারকাজিয়া এলাকার বাইরে আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। এক রুমে সর্বোচ্চ ছয়জন থাকতে পারবেন। মিনায় তাঁবুর অবস্থান থাকবে জোন-৫-এ। হারাম শরিফে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য এসি বাসে যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে চার লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা।
বেসরকারি হজ প্যাকেজ
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে আগ্রহীদের জন্য হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) তিনটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। খাওয়া ও কোরবানিসহ বিশেষ হজ প্যাকেজের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে সাত লাখ টাকা। সাধারণ প্যাকেজে ব্যয় হবে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা এবং সাশ্রয়ী প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকা।
হজ ফ্লাইট নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বুশরা ইসলাম বলেন, বিমান চায় কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই নির্বিঘ্নে হজযাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করতে। তাঁর ভাষায়, “হজযাত্রীরা আল্লাহর মেহমান। তাঁদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”

